ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

রম্যগল্পঃগর্দভতন্ত্র - লিখেছেন - নদ্দিউ সুকমা

গর্দভতন্ত্রঃনদ্দিউ সুকমা





একদা সুন্দরবন নামক এক বনে বাঘ, সিংহ, শেয়াল, গাঁধা এবং গণতন্ত্র ছিল । সিংহরা সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী,শেয়ালেরা ধর্মে বিশ্বাসী, বাঘেরা আত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী এবং গাঁধারা সকল বিশ্বাসেই বিশ্বাসী ছিলেন । তা গণতান্ত্রিক এ বনে সিংহ পুত্র পিতার উত্তরাধিকার সূত্রে এই বনের ক্ষমতার ভার পেয়েছিলেন । সিংহাসনে আরোহন করার খুশি উপলক্ষ্যে তিনি সারা বনে উৎসবের আয়োজন করলেন, ‘‘নির্বাচন উৎসব’ । ব্যাপক জোরেশোরে নির্বাচন উৎসব উদযাপিত হল, বাঘ- শেয়াল- গাঁধারা শোরগোল পছন্দ করতেন না তাই বাঘ-শেয়াল- গাঁধাদের প্রায়ই গলাগলি করে ভূট্টা এবং পাট ক্ষেতে ‘বিশ্রাম’ করতে দেখা গেল । বাঘ- শেয়ালগাঁধাদের অনুপস্থিতিতে তাই উৎসব ব্যাপক শান্তিপূর্ণ হল । যেসব বাঘ-শেয়াল- গাঁধাদের সার্কাস দেখার জন্য শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক খাঁচায় পোরা হয়েছিল তাদেরকেও একে একে ছেড়ে দেওয়া হল, তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ সার্কাসে অতি পারদর্শিতা লাভ করায় তাদেরকে ‘পারমানেন্টলি  সার্কাস দলে রেখে দেওয়া হল । কেউ ‘নালিশ করলে, সেটাও সিংহরা অতি উচ্চমান সম্পন্ন সার্কাস বলেই ধরে নিতেন । 

তো শান্তিপূর্ণ উৎসব শেষে সিংহ পুত্র জনসভা করলেন । তিনি নিজেই কিছুটা আশ্চর্য ছিলেন এ উৎসব এত শান্তিপূর্ণ কিভাবে হল । তাই, অনেকটা যেন নিজেকেই প্রবোধ দেওয়ার জন্য তিনি অকাট্য কিছু যুক্তি দাড় করালেনঃ ‘‘আজ গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে, আমাদের সংস্কৃতির বিজয় হয়েছে । আমি এই জাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য সংস্কৃতি সংরক্ষনের উদ্যেগ নিয়েছি । আপনারা সেই উদ্যেগের মর্মার্থ-গুরুত্ব বুঝেছেন বলেই আপনারা আমাদের জয়যুক্ত করেছেন । আমাদের সংস্কৃতি হাজার বছরের । হাজার বছর ধরে আপনারা ডোবার পানিতে ঘাঁস ডুবিয়ে খাচ্ছেন, ক্ষেতের মধ্যে গিয়ে গাঁন গাচ্ছেন এই সব আমাদের ঐতিহ্য, এগুলো আমাদের পরিচয়, এগুলো লালন-পালন করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য । ’’ 

মন্ত্রীসভার উপস্থিত সভ্যরাও অবাক হলেন, ডোবার পানিতে ঘাঁস খাওয়া কবে গাঁধাদের কিংবা অন্যান্যদের সংস্কৃতি হল কিছুতেই তারা বুঝলেন না । কিন্তু বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদুর । তারা সবাই বিশ্বাস স্থাপন করলেন । 

এদিকে এমন সময় জনৈক বাঘের এপিফ্যানি হল । তিনি দেখলেন এভাবে চললে, সিংহরা একচেটিয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করে ফেলবে । তিনিও জনসেবার আয়োজন করলেন,‘‘ ভাইসব, আজ জাতির অতি সংকটপূর্ণ মুহুর্তে আপনাদের কিছু কথা বলতে চাই । আজ আমরা অতি ভুলের মধ্যে আছি । আমরা ধর্মব্যবসায়ী শেয়ালদের হাত থেকে দেশকে উদ্ধার করে দেশব্যবসায়ী সিংহদের হাতে তুলে দিয়েছি । ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাকে যেমন সবাই নেতা এবং ক্ষেত্র বিশেষে খোদা মানে; এই সিংহরাও সংস্কৃতি নামক ধর্ম আমাদের ভিতর ঢুকিয়ে নিজেরা খোদা হইতে চাইছেন---’’ 

কতিপয় শেয়াল ও সিংহ মিলিত ভাবে বাঘমহাশয়কে কান ধরে মঞ্চ থেকে নামালেন । ক্ষণকাল উত্তম মধ্যমের পরে তাকে সার্কাস পার্টিতে নেওয়া হল । শেয়াল, সিংহ উভয়ই গাঁধাদেরকে বাঘদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলল । কিন্তু এদিকে আশ্চর্যজনক ভাবে বাঘমহাশয় আদালতের রায়ে ছাড়া পেলেন এবং কোনো একভাবে নিজ বাড়িতে পোঁছালেন । এরপর কোনো একভাবে তার বাড়ির সামনে সিমেন্টের বস্তা নিয়ে অনেকগুলো গাঁধা ঘুমিয়ে গেল এবং আদালতের বিচারপতি বদল হল । তারপর একদিন, আদালত বাঘমহাশয়ের ফাঁসির আদেশ কার্যকর করলেন । 

গাঁধারা সবাই বললেনঃ‘‘আরে ও বেটাতো গাঁধা ওর ফাঁসি হওয়া ঠিকই আছে ।’’ অতঃপর বাঘেরা সবাই তাদের খোলস ছেড়ে গাঁধাদের দলে যোগ দিলেন । 

এখন প্রশ্ন, এরপর কি হল ? ডোনাল্ড ট্যাম নামক এক মানুষ প্রজাতির প্রানী ঐ বনের পাশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করলেন । বিদ্যুতের আধুনিকতার ছোয়ায় বনের প্রানীদের শান্তিপূর্ণ বসবাসচিরশান্তিপূর্ণ বসবাসে পরিণত হল ।