ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ছোটোগল্পঃ আকাশের নীল তারা - লিখেছেন - মেহরাব হক খান


মোমো প্রতিদিন রাতে বাসার ছাদে বসে তারা গণনা করে। কিন্তু পেরে ওঠে না। প্রায় রাতেই মোমো তারা গণনা করার চেষ্টা করে । কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তার কাছে সব এলোমেলো হয়ে যায়। একদিন মোমো তার মাকে নিয়ে ছাদে আসে। অনেকক্ষণ যাবৎ তারা গল্প করে। গল্পের মধ্যে হঠাৎ  করে মোমো তার মাকে জিজ্ঞেস করে, “মা, স্কুলে সবার বাবা টিফিন দিতে আসে। আমার বাবা আসে না কেন?”

মোমোর মা একবারে চুপ মেরে গেলো। কি বলবে? মোমোর বাবা তো আরও অনেক আগেই মারা গেছেন। এই কথা শুনলে তো মোমো খুব কষ্ট পাবে! তাই মোমোর মা কোন উত্তর দিতে পারছে না। মোমো তার মাকে আবার জিজ্ঞেস করল, মা, কথা বলছ না কেন? চুপ হয়ে গেলে কেন?

মোমোর মা মোমোকে বুঝ দেবার জন্য বলল, তোর বাবা তো এখন আমাদের সাথে থাকে না। সে থাকে আকাশের একটা তারায়।

মোমো বলল, কোন তারায়, মা? আমি তো দেখতে পাচ্ছি না!

মোমোর মা বলল, ঐ তারা সবসময় উঠে না। ঐ তারার রং নীল। মাঝে মাঝে উঠে।

 

এখন থেকে মোমো প্রতিদিন রাতে ছাদে বসে থাকে ঐ নীল তারা দেখার জন্য। মাঝে মাঝে আবার তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কারণ তার মন শুধু চায় তার বাবাকে দেখতে। একদিন সে তার মাকে জিজ্ঞেস করল, মা, আমার বাবা কবে দেখা দিবে?

মোমোর মা বলল, কিরে মা? তুই হঠাৎ এই প্রশ্ন করলি?

মোমো বলল, আজ আমার স্কুলের বান্ধবীরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, তোর বাবা কোথায়? কি করে? আমি ওদের বলেছি, আমার বাবা আকাশের নীল তারায় থাকে। কিন্তু ওরা বলল, আকাশে নাকি নীল তারা উঠে না!

মোমোর মা বলল, তুই যেদিন পড়ালেখা করে অনেক বড় কিছু হবি সেদিন তোর বাবা তোকে দেখা দিবে।

মোমো তার মার এই কথা মনে জাপটে ধরে বড় হতে থাকে। প্রতি ক্লাসেই সে খুব ভালো রেজাল্ট করে। পিইসি পরীক্ষায় ঢাকা ডিভিশনের মধ্যে ১ম হয়। জেএসসি পরীক্ষায় ঢাকা ডিভিশনের মধ্যে চতুর্থ হয়। এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকা ডিভিশনের মধ্যে ১ম হয়। এতো ভালো রেজাল্ট এর পরেও তার মন ভরল না। সে আরও ভালো করে পড়ালেখা করে এইচএসসি পরীক্ষায় সারা বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম হয়। তারপর সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে বিএ অনার্স এবং এম.এ. পাশ করে। মোমোর পড়ালেখার জীবন শেষ হলো। এখন সে চাকরী খুজতে লাগল। কিন্তু কোন ভালো চাকরী পাচ্ছিলো না । কারণ তার কোন মামা – খালু নেই । একদিন মোমো হতাশ হয়ে রমনার বটমূলে বসে রইল। হঠাৎ করে তার এক বন্ধু রিফাত আসল। এসে বলল, কিরে মোমো, কি অবস্থা ?

 মোমো বলল , ভালো নারে ভাই।

রিফাত বলল,  কেন ?

 মোমো বলল, কত কষ্ট করে ভালো রেজাল্ট করলাম।কিন্তু কোন ভালো চাকরী পাচ্ছি না !

রিফাত বলল, আমি তোকে একটা ভালো বুদ্ধি দিতে পারি। বুদ্ধিটা কাজে লাগলে কি খাওয়াবি বল ?

মোমো বলল, আগে বুদ্ধিটা কি বল?

রিফাত বলল, তুই তো অনেক ভালো স্টুডেন্ট। তাই তুই বিসিএস পরীক্ষা দে। আমি ৪০০% শিওর, তুই পাস করবি-ই ।

মোমো বলল, ভালো বুদ্ধি তো! আমার মাথায় কেন যে আগে এই বুদ্ধিটা এলো না!

রিফাত বলল, এখন বল, বিসিএস পাশ করলে আমাকে কি খাওয়াবি?

মোমো বলল, তুই যা চাস

 

 

 মোমো বিসিএস অ্যাডমিনে পরীক্ষা দিলো। সেই পরীক্ষায় সে প্রথম হলো। তারপর এক উপজেলায় এসিল্যান্ড হিসেবে নিযুক্ত হলো। একদিন মোমো তার মাকে বলল, মা, তুমি জানো, আমি কেন এতো ভালো রেজাল্ট করেছি?

মা বলল, কেন?

মোমো বলল, মনে আছে, তুমি আমাকে বলেছিলে, আমি যেদিন বড় কিছু হবো সেদিন নাকি আমার বাবা আমাকে দেখা দিবে? এই কথা আমার সবসময় মনে থাকত। তাই আমি এতো ভালো রেজাল্ট করেছি।

সেদিন রাতে মোমো স্বপ্নে দেখল, আকাশে একটা নীল তারা উঠেছে এবং সে তারা থেকে তার বাবা বেরিয়ে এসে বলল, মা, কেমন আছিস? মোমো কিছু বলার আগেই তার মা তাকে ডাক দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দিলো।

 

+লেখক: মেহরাব হক খান, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স স্কুল এন্ড কলেজে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। বাবার অনুপ্রেরণায় সর্বদা মনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করেন… বড় হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করার স্বপ্ন দেখেন।