ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

বিবর্তন - লিখেছেন - মৌরি হক দোলা



শিমুলপুরে বেশ অনেকগুলো বছর পরে এলাম। অনেকটাই বদলে গিয়েছে। অনেকটা না শুধু………বেশ অনেকটা! একেবারে আকাশ আর জমিনের মাঝে যেমন তফাত ঠিক তেমনই তফাত সেই শিমুলপুর আর এই শিমুলপুরের মধ্যে।

বছর বিশেক আগে যখন শিমুলপুর ছেড়ে গিয়েছিলাম, তখন চারিদিকটা কেমন সবুজে ঢাকা ছিল! বেশ ঘন গাছ-গাছালি চোখে পড়ত! আর সেইসব গাছের সবুজ রং যেন প্রশান্তি এনে দিত এই দু’নয়নে! তখন চোখে পড়ত কিছুটা দূরেই ছাড়া ছাড়াভাবে অনেকগুলো ছোট্ট ছোট্ট কুটির। সন্ধ্যের পর সে কুটিরের মৃদু আলো খুব নিকট দূর হতে ক্ষীণ, সরু রেখা হয়ে দেখা দিত। কখনো বা দিত না! তখন নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা থাকত আমার চিরপরিচিত সেই শিমুলপুর!

সেই অন্ধকার রাত্রিগুলোতে শিমুলপুরের কেউ ঘর থেকে বের হতো না। বাইরেটা নির্জন হয়ে পড়ে থাকত আর মাঝে মাঝে শোনা যেত একযোগে ডেকে ওঠা শিয়ালের হাঁক। আহ্…...সেই শিমুলপুর! সেইসব দিনগুলোতে মফস্বল শহর শিমুলপুরকে আর মফস্বল বলার জো ছিল না। দেখে যেন মনে হত এ কোনো এক পাড়াগাঁয়েরই প্রত্যক্ষ চিত্ররূপ।

…………

আমি আমার সেই ছোট্ট ভাড়া ঘরটায় ঐ রাত-বিরাতের অন্ধকারে হারিকেনের আলো জ্বালিয়ে বইয়ের পাতা উল্টাতাম। পৌষের ঠান্ডা মৃদু হাওয়া যখন এসে পৌঁছত আমার সেই ঘরে, আমি তখন লালরঙা লেপটা আমার আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে শুয়ে থাকতাম। এক এক রাতে তারাশঙ্কর বাবুর বইয়ের পাতা উল্টোতে উল্টোতে কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতাম! সকালবেলা ঘুম ভাঙতেই হারিকেনের চিমনিতে বসে যাওয়া কালো কালো দাগগুলো এলোমেলোভাবে একসাথে নজর কাড়ত। তখনো মৃদু আলো জ্বলছে। সারারাত অবিরত জ্বলতে থাকায় হারিকেনের উপজীব্য কেরোসিন তখন প্রায় শেষের পথে। একটু আলোর যোগানে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হতে হত কেরোসিন নামক উপযোগের। আর সেই আলোতেই পূর্ণিমার মতো ঝকঝকে হয়ে থাকত শিমুলপুরবাসীদের প্রত্যেকটি ঘর!

………….

চত্বরে পৌঁছতেই আমি অটো থেকে নেমে দাঁড়ালাম। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে শিমুলপুরেও। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে একটু সরে এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল……..আমার অবসরের সঙ্গী সেই বনের ঝোঁপটা যেখানে ছিল এখন ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে মস্ত বড় এক দালানকোঠা। বড় বড় অক্ষরে সেখানে লেখা “উপজেলা পরিষদ”।

শিমুলপুরে এতদিন পর এসে সেই পুরনো স্মৃতিমাখা স্থানগুলোর ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পেয়ে মনের মাঝে জেগে ওঠা এক টনটনে ব্যাথা আর সেই চিরপরিচিত পাড়াগাঁস্বরূপ মফস্বল শহরের এত উন্নতি দেখে এক অজানা আনন্দ------তখন যেন আমার মনের মাঝে এক মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল, যে মিশ্র অনুভূতিটাকে ভাঙনের মাধ্যমে কখনো আলাদা করে তার স্বাদ বুঝতে পারা যায় না!

………….

আশেপাশের আর সব কিছুর পরিবর্তন হলেও উপজেলা চত্বরের ভিতরের দিকের সেই রাস্তার গতিপথটা আর সেই বাড়িটা এখনো তাদের যার যার স্বস্থানেই রয়েছে। কেবল মেঠোপথের স্থলে পিচঢালা পথ আর দু’পাশের গাছের সারির বদলে বড় বড় দোতলা-তেতলা বাড়ি…………..কাকীদের সেই ছোট্ট টিনের ঘরটাও দেখলাম একপাশে পরে রয়েছে, যদিও তারই সামনে কিছুটা উঠোন ছেড়ে দিয়ে গড়ে উঠেছে চমৎকার এক দালান! আর আমি যে ছোট্ট ঘরটায় থাকতাম, তার আর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পেলাম না! দেখতে পেলাম, সেদিক বরাবরই গড়ে উঠেছে এক ইট-সিমেন্টের প্রাচীর।

বাইরের উঠোনে বসে বিকেলের সোনালী আলোয় গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মনে আসছিল যে, শহরের যান্ত্রিক জীবনের ছোঁয়া এখানেও এসে পৌঁছে গিয়েছে। সবাই নিজের মতো করে আলাদা থাকতে শিখেছে। আগের সেই বন্ধন খুঁজে পাওয়া যে বড় মুশকিল তার সাক্ষী হয়ে এই প্রাচীরটা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।

শীতের দুধ-চিতই পিঠা আর এক গ্লাস পানি হাতে কাকিমা আবার বেরিয়ে এলেন। মুখে সেই চিরচেনা হাসি। তার এই হাসিটুকুনি যেন আমার ভাবনায় ছেদ ফেলে নতুন করে ভাবনা জাগায় যে, নাহ্, যান্ত্রিকতা এখনো সমস্তকিছু তার দখলে নিয়ে নিতে পারে নি। বাংলা মায়েরা এখনো তাদের ছেলেকে আপন করে নিতে পারে, এখনো বাড়িতে কেউ এলে আতিথেয়তার মাধ্যমে তাদেরকে বরণ করে নিতে জানে!

এই দীর্ঘ সময়ে দিবস যেমন গড়িয়ে চলেছে, রাত্রি যেমন একের পর এক পার হয়েছে, ঠিক তেমনই বেড়েছে কাকিমার বয়সও। তখনের চল্লিশের কাকি আজ নিশ্চয়েই ষাটের গোড়ায়! তার শরীরের প্রতিটি চামড়ার নেতিয়ে পড়া ঘুচকানো ভাঁজ সেই বয়সের জানান দেয়। বয়সের জানান দেয় সেই দীঘল কালো চুলের উপর লেপ্টে থাকা সাদা রঙটাও।

অবাক লাগে ভীষণ, কিভাবে কিভাবে বিশটি বছর পেরিয়ে গেল! আমারো অবশ্য বয়স কম হয় নি! সেদিনের সেই যুবক ছোকড়া আজ একজন পরিপূর্ণ মধ্যবয়সী ব্যক্তি! লোক! সময় এমনই যাদু জানে, জানে পাল্টে দিতে অনেক কিছুই!

-সেই যে গেলে শিমুলপুর ছেড়ে, তারপর আর কোনো খবর নেই! আজ এতবছর পর কি মনে করে এলে……..তা বাবা, বিয়ে থা নিশ্চয়ই করেছো, ছেলেপান কি?

বিয়ের কথা কানে আসতেই আমার কেমন চমক ফিরল। বিয়ে! বিয়ে…….বিয়ে তো আমি করেছিলামই! একটা চমৎকার সংসার সাজানোর স্বপ্ন ছিল দু’জোড়া নয়নে। কিন্তু…..হায়! সবার কপালে বোধ হয় সৃষ্টিকর্তা সব সুখের কথা লেখেন না! তাই হয়তো…………

শুধু কাকিমা কেন, এ মহল্লার প্রায় সবাই জানত আমার জীবনের সেই দিনগুলোর কথা। কাকিমা কি তা ভুলে গিয়েছেন না কি ভেবেছেন আর সবার মতো আমারো শক্তি আছে সত্যটাকে স্বাভাবিকভাবে বরণ করে নেওয়ার ?

আকাশে সূয্যিটা লাল আভা ছড়িয়েছে। একটু পরেই বোধ হয় আজান দিয়ে দেবে।


-ও বাবা, কি ভাবছো এতো ?

-কাকিমা, আজ উঠি। সন্ধ্যে হয়ে এল। এখানে এক বন্ধুর বাড়িতে এসেছি একটা কাজে। যাবার পথে ভাবলাম দেখে যাই, আপনারা কেমন আছেন………তাই আর কি!

-সে কি! আজ থাকবে না? এতদিন পরে এলে…….

না, কাকিমা। অন্য এক সময় আসব নে।


আমি কাকিমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বেরিয়ে এলাম। আযানের সুর ভেসে আসছে। রাহিমা নিশ্চয়ই এখন নামাজে বসবে! তার স্বামীও নিশ্চয়ই…..!

রাহিমার চমৎকারভাবে সাজানো সংসারটা দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। তার সংসারে ভগবান নিশ্চিৎভাবে সুখ দিয়েছেন, আর তা যেন আরো দেন! আমার ঘরে সন্ধ্যে দেওয়ার মতোও কোনো রমণী আজো নেই! তাও আমি সুখী! কারণ, আমি জানি, তুমি সুখী……….


সন্ধ্যের আঁধারে ডুবে আছে শিমুলপুর। সেই অন্ধকার ভেদ করে আমি ক্রমশই সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। এখন আর শিমুলপুর আগের মতো নিকষ কালো আঁধারে ডুবে থাকে না। বৈদ্যুতিক আলো চোখে পড়ে দূর থেকে বহুদূরে………









লেখকঃ মৌরি হক দোলা

ইতিহাসনামার একজন সাব এডিটর।স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন,ভালোবাসেন সে স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকতে।