ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ভারতের স্বাধীনতায় মুসলমানদের অবদান কতটুকু? - লিখেছেন - আসাদুজ্জামান খান জিসান


"এই ভবনে কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ"- সংবলিত সাইনবোর্ড ঝোলানো থাকতো ব্রিটিশ শাসিত ভারতের অনেক ক্লাবঘরে। এমনি হাজারো শোষণের ক্ষত এবং পুঞ্জীভূত ক্ষোভ নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে থাকে। স্বাধীনতার এই স্বপ্ন রাজা-প্রজার দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছিল। ধর্মীয় দূরত্ব দূর করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করেছিলো ব্রাহ্মণ আর মুচি, মোল্লা আর মুসল্লি। হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস জমা আছে ভারতীয় উপমহাদেশের জেলাগুলোতে। রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, প্রতিটি প্রদেশের মাটি। ৪৭ এ স্বাধীনতা মিলেছে বটে, সাদা চামড়ার শোষণের অবসান ঘটিয়ে শুরু হয়েছে স্বজাতির শোষণ।

গত ৭০ বছরে বিপ্লবীদের অনেকেই হয়তো অবাক হয়ে বলেছেন, "এমন স্বাধীনতা চাইনি!"।
কেননা, স্বাধীন দেশে জন্ম নিয়েও শোষণ থেকে রেহাই পায়নি ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ। শোষণের অনেক হাতিয়ার আমরা প্রত্যহ দেখছি। তবে, সাম্প্রদায়িক শোষণের মত ভয়াবহ হাতিয়ার একটিও নেই। বিগত দিনগুলোতে আমরা দেখতে পেয়েছি, ভারতীয় মিডিয়াতে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সাম্প্রদায়িক বক্তব্য এবং দুই পক্ষের বিপথগামী মানুষের সশস্ত্র হামলা।
সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর নতুন নাগরিক আইনের মাধ্যমে চলছে ভারত থেকে মুসলমানদের উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্র। একই সাথে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, ভারতের স্বাধীনতায় মুসলমানদের অবদানকে।



বিশেষ রাজনৈতিক দলের মধ্যে সাম্প্রদায়িক হিংসা বিরাজ করতেই পারে, তাই বলে ইতিহাস কখনোই তার নির্মাতা কে ভুলে যায় না। বারবার সে সত্য প্রকাশে থাকে অবিচল। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা কে বেগবান করতে হিন্দু-মুসলমান কাজ করেছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। তবে, স্বাধীনতা উত্তর ভারতে উগ্র-জাতীয়তাবাদ ভর করেছে সাম্প্রদায়িকতার কাফনের কাপড় পড়ে।
আর এভাবেই তাজা প্রাণ গুলো ঠাঁই করে নিয়েছে শ্মশান আর গোরস্থানে। কেবলমাত্র সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের নিন্দা করাটা হয়ে যায় এক পাক্ষিক।
বহুবছর অসাম্প্রদায়িক দলগুলো জনগণের সেবা করার সুযোগ পেয়েছিল। উন্নত জাতি গঠনের প্রথম শর্ত শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে সাম্প্রদায়িকতার দুর্গন্ধমুক্ত করার চেষ্টাও তারা করেনি। দূষিত শিক্ষাব্যবস্থায় বড় হওয়া মানুষগুলো সংঘাত ছাড়া আর কিইবা দিতে পারে সমাজ-রাষ্ট্র তথা আগামী প্রজন্মকে?

সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক কোন দলই নিজেকে ভোট ব্যাংকের কাছে দেউলিয়া ঘোষণা করতে চায় না।
ভারতের ইতিহাসের পাতাগুলো মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস, জাওহারলাল নেহরু, বল্লভ ভাই প্যাটেলদের মত নেতাদের নাম থাকলেও, কোন এক অশরীরীর নির্দেশে মুসলমানদের নাম গুলো হারিয়ে যেতে বসেছে।
অথচ The Indian Musalmans নামক বইটিতে ১৮৭১ সালে ইংরেজ ঐতিহাসিক উইলিয়াম উইলসন হানটার প্রশ্ন করেছিলেন,
"Are they bound in conscience to rebel against the Queen?"



১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭, এই ১৯০ বছরে হাজারো মুসলমান স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন দিয়েছেন, জেল খেটেছেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামী ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ এর সংগ্রামের কথা আমরা সবাই জানলেও, মুসলিম মহিলা বেগম হজরত মহল এর কথা প্রচার-প্রসারের বাইরে।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী, আহমদ উল্লাহ শাহ এর মাথার দাম ছিল ৫০ হাজার টাকা। তার বিপ্লবী মৃত্যু আজ তাচ্ছিল্যের বস্তু। ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ত্যাগগুলো আর স্মরণ করা হয় না।
মাওলানা কাসেম সাহেবের নেতৃত্বে উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দ মাদ্রাসা ছিল ব্রিটিশবিরোধী ঘাঁটি। আতাউল্লাহ শাহ বুখারী, মাওলানা হোসাইন আহমদ, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা গোলাম হোসেনদের মতো মানুষ বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। তবে, তাদের কেউ স্মরণ করে না। উল্টো মাদ্রাসাগুলোকে সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর বলা হয় আজকাল।



"কমরেড" ও "হামদর্দ" ইংরেজিবিরোধী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মাওলানা মোহাম্মদ আলী এবং শওকত আলী। স্বাধীন ভারতে ইতিহাসের ছিন্ন পাতায় নাম লেখা হয়নি তাদেরও।
টিপু সুলতান, মীর কাশেম মজনু শাহরা ইংরেজদের গুলিতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেলেও, ইতিহাসের পাতা থেকে তাদের অবদান কেমন করে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সেটাই বড় প্রশ্ন।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর স্বাধীনতা বিপ্লবে আত্মার সঙ্গী আবিদ হাসান, শাহ নেওয়াজ খান, ডি.এম. খান, আজিজ আহমেদ, কর্নেল জিলানী, আব্দুল করিম গনিদের মত লোকদের স্মরণ করার কেউ কি আছেন?
সামান্য একজন ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে ব্যর্থ ক্ষুদিরামের কথা সমগ্র ভারত জুড়ে থাকলেও,  ১৮২৭ সালের সমগ্র ভারতের ভাইসরয়, লর্ড মেয়োকে আন্দামান জেল পরিদর্শনের সময় হত্যাকারী, শের আলী আফ্রিদি পরিচিত একজন আততায়ী হিসেবে।


ভারত স্বাধীন করার পরে, কাজী আতাউল্লাহ খানের মৃত্যু হল কারাগারে। সেই রহস্য আজও অজানা। জেল খানায় মরে গিয়েছিলেন ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি। ইতিহাসের পাতায় সর্বভারতীয় কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট হাকিম আজমল খান এর নাম খুঁজে পাওয়া যায়না কোথাও, তবে নেহেরুজির নাম সবাই জানেন। ব্যারিস্টার খাজা আব্দুল মজিদ সস্ত্রীক জেল খাটেন। ১৯৬২ সালে তাদের মৃত্যু হয়। সাথে তাদের মৃত্যু হয় ইতিহাসের পাতা থেকেও।
জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড সম্পর্কে আমরা জানি তবে জানিনা ,প্রতিবাদী ব্যারিস্টার সাইফুদ্দিন কিছলুর কথা। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কথা জানলেও, বাংলার মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে চর্চা হয় না। যিনি বুঝতে পেরেছিলেন ব্রিটিশ দাসত্ব দূর করতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বিকল্প নেই।
ঠিক এমনি ভাবে হারিয়ে গিয়েছেন মাওলানা হযরত মুহানি, যিনি সর্বপ্রথম ডাক দিয়েছিলেন "ব্রিটিশ বিহীন স্বাধীনতা চাই"।
আন্দামানের জেলখানা আজও মুসলিম স্বাধীনতাকামীদের ইতিহাসের চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীরবে।
এমনি হাজারো মুসলিম সন্তানদের আত্মত্যাগ ভারতমাতার ভূমিতে মেরুদন্ড সোজা করে স্বাধীনভাবে বাঁচতে শিখিয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোর পেছনের মূল ভূমিকা পালন করে রাজনৈতিক স্বার্থ। সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ প্রচার করে তৈরি করা হয় ধর্মীয় সহিংসতা আর এই সহিংসতা বুঝতে পারে না, কে হিন্দু, কে মুসলিম, সে শুধু বুঝতে পারে রক্তপাত আর হাঙ্গামা।


ধর্মীয় আবরণে কোন ভাবেই স্বাধীনতার মহান বীরদের ছোট করা উচিত নয়। সাম্প্রদায়িকতার ছদ্মবেশে কোন ধর্মের অনুসারীদের উচ্ছেদ করবার পরিকল্পনা, লর্ড ক্লাইভের বংশধর এবং ব্রিটিশ প্রেতাত্মার বাহকদের।
আমরা আশফাকুল্লা খান এবং রামপ্রসাদ বিসমিল এর বন্ধুত্বের আদর্শে বিশ্বাসী। আর সেই বিশ্বাস থেকেই বলতে চাই, ভারতের মাটি থেকে মুসলমানদের উচ্ছেদ রুখতে, চর্চা করতে হবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে, হিন্দু মুসলিম হৃদ্ধতা কেমন করে অবসান করেছিল শতবছরের শোষণের ইতিহাস।

ধর্মীয় পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে কোনভাবেই একজন ব্যক্তির নাগরিকত্ব নির্ধারিত হতে পারেনা। অসাম্প্রদায়িক উপমহাদেশের স্বপ্ন নিয়ে আজকের মত এখানেই বিদায়।  

+লেখক: আসাদুজ্জামান খান জিসান
ইতিহাসনামা.কম এর ৩ জন সহ-প্রতিষ্ঠাতার একজন। হাইবারনেশনে থাকা ভাল্লুকদের প্রতি অসীম ঈর্ষা রয়েছে তার।
লেখকের ফেসবুক:ফেসবুক আইডি লিংক