ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ফিচার- জলে কুমির ডাঙায় বাঘ - লিখেছেন - মৌরি হক দোলা



মনে করুন, আপনি একটি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন, পানির ভেতর থেকে একটি কুমির তার মস্ত মাথাটা বের করে আপনা্র দিকে অপলক চেয়ে আছে। ধীরে ধীরে পানিতে স্রোত বইয়ে দিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে আসছে আপনার দিকে। স্থির দৃষ্টি! আপনার গলা হঠাৎ শুকিয়ে গেল। সামনে অজস্র জলরাশি ফেলে রেখে আপনি হাঁটা দিলেন পেছন দিকে। এক কদম.. দুই কদম.. হঠাৎ শুনতে পেলেন... হালুম!! হালুম!!! গর্জনের সাথে সাথে অতিশয় শক্তিধর প্রাণিটি আপনার দিকে হেলেদুলে এগিয়ে আসছে!!!!!!!


কি করবেন তখন আপনি? ডানে-বামে দৌড় দিবেন? কল্পনার খাতিরে আমরা একটু ধরেই নেই না, আপনার সম্মুখ আর পেছন ছাড়া স্থানটিতে আর কোনো দিক নেই। পালাবার পথ নেই! তখন?

জ্বি। অবাস্তব কল্পনা। কেননা, যতই কল্পনা করি না কেন, দিক কিন্তু আরো রয়েছেই। তাই মন এটা কখনোই মেনে নেবে না, আর আমিও আমার প্রশ্নের উত্তর পাবো না।

তবে জীবন কিন্তু কখনো কখনো আমাদের এহেন পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়ই! বাস্তব জীবনে প্রায়শই আমরা এমন পরিস্থিতির সামিল হই। এই পরিস্থিতিতে পরস্পর বিরোধী এবং সমান শক্তিশালী দুটি প্রেষণা একই সময়ে আমাদের সামনে এসে হাজির হয় এবং এদের মধ্যে কোনো একটি প্রেষণার অতৃপ্তির জন্য আমাদের মধ্যে একটা ব্যক্তিগত অতৃপ্তিবোধ দেখা দেয় এবং আমরা আবেগমূলক অস্থিরতায় ভুগি। আর যখনই এরূপ ঘটে তখনই তা হয়ে ওঠে 'দ্বন্দ্ব’ বা Conflict এবং এটি অবশ্যই Intra-personal Conflict। 

আমরা সাধারণত চার ধরণের Intra-personal Conflict এ ভুগি—

• আকর্ষণ-আকর্ষণ দ্বন্দ্ব
• বিকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্ব
• আকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্ব
• দ্বিগুণ আকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্ব


আকর্ষণ-আকর্ষণ দ্বন্দ্বে আমাদের সামনে দুটি সমান আকর্ষণীয় বস্তু থাকে এবং বিষয়টি এমন হয় যে, দুটি বস্তুর মধ্যে যেকোনো একটি আমাদের গ্রহণ করতে হবে। যেমন—ধরুন, আপনার কন্যার জন্য দুটি বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে, দু’জনেই এম.এ. পাস এবং দুজনেই প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা। তখন কোন ব্যক্তি পরিণত হবেন আপনার লক্ষ্যবস্তুতে ?
আপনারা যারা একটু চালাক চতুর তারা কিন্তু খুব সহজেই দুজন ব্যক্তির মধ্যে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েই অবসান ঘটাতে পারেন আপনার এই আকর্ষণ-আকর্ষণ দ্বন্দ্বের!

উপরের উদাহরণটি আরেকবার পড়ুন। “জলে কুমির ডাঙায় বাঘ” এরূপ পরিস্থিতিতে আপনার সিদ্ধান্ত কি? সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন আমরা কিন্তু রূপক “জলে কুমির ডাঙায় বাঘ” পরিস্থিতিতে কখনো না কখনো কেউ না কেউ পড়তেই পারি! আর এটিই হচ্ছে বিকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্ব।এ দ্বন্দ্বে দুটি অপ্রীতিকর লক্ষ্যবস্তু থাকে এবং আমাদের বাধ্য হয়ে যেকোনো একটি গ্রহণ করতে হয়।
বিকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্বে আমরা সাধারণত দু’ধরনের আচরণ করে থাকি।
প্রথমত, আচরণ ও চিন্তার দোদুল্যমানতা দেখা দেয়। একটি লক্ষ্যবস্তু যতই কাছাকাছি আসতে থাকে ততই আমাদের বিতৃষ্ণা বাড়তে থাকে। তখন আমরা এটা ছেড়ে অন্য লক্ষ্যবস্তুর প্রতি ধাবিত হই এবং যতই এর কাছাকাছি হতে থাকি ততই বিরক্তির সীমা ছাড়িয়ে যেতে থাকে।
দ্বিতীয়ত, দ্বন্দ্বমূলক পরিস্থিতি ত্যাগ করার প্রচেষ্টা। যেভাবেই হোক আমরা দ্বন্দ্বের থেকে বেরিয়ে যেতে চাই, কিন্তু কোনো্ এক অদৃশ্য শক্তির কারণে আমরা ব্যর্থ হই।

আকর্ষণ-আকর্ষণ দ্বন্দ্ব এবং বিকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্বে লক্ষ্যবস্তু থাকে দুটি। কিস্তু আকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্বে একটিমাত্র লক্ষ্যবস্তু থাকে, কিন্তু এটি একই সাথে কাছেও টানে, আবার দূরেও সরিয়ে দেয়। অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তুতে একই সাথে আকর্ষণীয় এবং বর্জনীয় উভয় গুণই বর্তমান থাকে। লক্ষ্যবস্তুটির আকর্ষণীয় গুণের কারণে আমরা এর দিকে অগ্রসর হই। কিন্তু অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে ঋণাত্মক গুণটি বেশি শক্তিশালী হওয়ায় অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত রাখে। ফলে আমরা হতাশায় নিমজ্জিত হই।
আকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্ব আমাদের জীবনে সচরাচর ঘটে, কিন্তু এর সমাধান তুলনামূলকভাবে কঠিনই বটে

দ্বিগুণ আকর্ষণ-বিকর্ষণ দ্বন্দ্বে  লক্ষ্যবস্তু থাকে দুটি এবং প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুরইও মন্দ উভয় দিকই থাকে। ভালো দিকটি আমাদের আকর্ষণ এবং মন্দ দিকটি আমাদের বিকর্ষণ করে। কিন্তু দু’টির যেকোনো একটি আমাদের গ্রহণ করতেই হয়।

দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সামনে যখন একই সাথে দুটি পরস্পর বিরোধী প্রেষণা উপস্থিত হয় তখন যেকোনো একটি প্রেষণার প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া করতে হয়। কেননা, দুটি প্রেষণার পরিতৃপ্তি একই সাথে সম্ভব নয়। ফলে আমরা সমস্যায় পড়ি এবং দ্বন্দ্বে ভুগি।সমস্যাটির সমাধান না হলে আমাদের মধ্যে এক অপ্রীতিকর অনুভূতির সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো মা্নসিক সমতা ক্ষুণ্ণ হয় এবং দ্বন্দ্বের সমাধান করতে না পারলে এবং তা অধিক সময় স্থায়ী হলে তা আমাদের মধ্যে উদ্বেগ (Anxiety) সৃষ্টি করে, যা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করে।
তাই আমাদের জীবন দ্বন্দ্বমুক্ত নয়, হোক দ্বন্দ্বের সাথে সফলভাবে লড়াই করা সফল জীবন!!

লেখকঃ মৌরি হক দোলা

ইতিহাসনামার একজন সাব এডিটর।স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন,ভালোবাসেন সে স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকতে।