ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

চলন্ত ট্রেনে একদিন - লিখেছেন - তাসনোভা তুশিন


গ্রীষ্মের ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ। ভাবলাম বাড়ি গিয়ে ছুটি কাটিয়ে আসি। মা বাবার কথাও বেশ মনে পড়ছিল। তাই প্রয়োজনীয় গোছগাছ করে শেষে স্টেশনে এসে হাজির হলাম। কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে ট্রেনে চেপে বসলাম। সেদিন সকালের ট্রেনে যাত্রা করছিলাম। মৃদু রোদের আলো যখন ঘাসের ওপর পড়ছিলো দুর থেকে দেখতে বেশ লাগছিলো। সকালের বাংলাদেশ আর তার গ্রাম্য পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করছিলো। বার বার তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিলো।


তারপর শেষে যখন সিলেটের কাছাকাছি আসলাম তখন পাহাড় পর্বত বেষ্টিত শহরটাকে সত্যি পটে আঁকা ছবির মত লাগছিলো। যথা সময়ে ট্রেন ছাড়লো। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দৃশ্যাবলি দেখছিলাম আর বাড়ির কথা ভাবছিলাম। বাড়ি গিয়ে কি করব, কোথায় কোথায় যাব- এসব নিয়ে খুব এক্সাইটেড ছিলাম। হঠাৎই একটা ঘটনা আমার মনকে ভারাক্রান্ত করে তুললো।


আমি যেই বগিতে উঠলাম সেই বগিতে আরও দুইজন প্রৌঢ় মহিলা ছিল। প্রথমে তাদের লক্ষ্য করিনি। কিন্তু একটা ঘটনা আমাকে অবাক করে তুললো। প্রৌঢ় মহিলা দুজনের মধ্যে একজন একটু বেশি বয়স্কা আর আরেকজন কম। অধিক বয়স্কা মহিলার দিকেই আমার নজর। তিনি এক দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছেন। তবে তাকে দেখে মনে এক অদ্ভুত অনুভুতির সৃষ্টি হয়, যেন রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা, জীবনানন্দ দাসের রূপসী বাংলা তারই প্রতিচ্ছবি। তিনি দেখতেও শুশ্রী ছিলেন। গায়ের রং, মুখের রং গড়ন সবই সুন্দর ছিলো। তবে দেখে মনে হচ্ছিলো যেন কোনো এক অজানা কষ্ট তার বুকটাকে চিড়ে চিড়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যাই হোক তবে অন্য বৃদ্ধাটি ভিন্ন রকমের ছিল। তখন তাদের দেখে তাদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ বোধ করলাম। তাই আমি অধিক বয়স্ক মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?" সে কিছুক্ষণ আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে উত্তরে বলল, "কোথায় আর যাবোরে মা! যেদিকে দুই চোখ যায় আর নিয়তি যেখানে নেয় সেখানেই যাব।” এরপর সে অদ্ভুতভাবে হাসতে লাগলো। আমি কিছুটা অবাক হলাম। প্রথমে বুঝতে পারি নি। তবে পরে যখন অন্যজনের সাথে কথা বললাম, তখন সে ব্যাপারটা খোলাসা করল।


 তিনি বললেন আমরা গাজীপুর যাচ্ছি। আর বললেন যে উনি মানসিক ভরসাম্য হারিয়েছেন। তুমি কিছু মনে করোনা, মা। আমি বললাম, “ওনাকে চিকৎসা করান নি? আর এমন হলো কিভাবে?” জবাব পেলাম সে নাকি এক করুণ কাহিনী!! তারপর আমার আগ্রহ দেখে উনি সব বললেন। শুনে আমার খারাপ তো লেগেছেই উপরন্তু আমার মাঝে ওই শকুনদের প্রতি তীব্র ঘৃণা আর রাগ জন্মালো, যারা তার এই অবস্থার জন্য দায়ী।



তার বর্ণনার সারমর্ম এমন-- ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার নরপশুগুলো যখন বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন তার বড় ছেলে বাঙালির মুক্তির জন্য যুদ্ধে অংশ নেয়। বেশ সাজানো সংসার ছিলো তার। দুই মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে বেশ সুখের সংসার ছিল তার। ছেলে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল। বড় মেয়েটার ওই বছর আই. এ. পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল আর ছোট মেয়েটা ছিল প্রতিবন্ধী। স্বামী ছিল নামকরা সাংবাদিক। কিন্তু তার এই সুখ হয়তো ওদের আর সহ্য হয় নি। বড় ছেলে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে চলে যায়। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের পর বাঙলিরা বিজয় অর্জন করে। কিন্তু কিছু মর্মান্তিক ঘটনা তাকে এই বিজয়ের আনন্দকেও অনুভব করতে দেয় নি। তাদের পরিবার গ্রামেই ছিল। বিজয়ের কিছুদিন আগে শান্তিকমিটির লোকজন এসে তার স্বামী আর তার ছোট মেয়েকে তার সামনেই গুলি করে হত্যা করে। বড় মেয়ে পূর্নতাকে ওরা তুলে নিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষ হলে বিজয়ের পতাকা হাতে করে ছেলের আর মায়ের কাছে ফেরা হয় না। এই ঘটনার পর তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যায়। এরপর অনেক চড়াই উতরাই পার হয়ে উনি গাজীপুরের বৃদ্ধাশ্রমে এসে উপনীত হন। অনেক চিকিৎসা করানোর পরও উনি সু্স্থ হন নি। এরপর থেকে উনি এখনেই আছেন। সে মাঝে মাঝে আপন মনে কান্না করেন আর অনেক ভেঙে পড়েছেন উনি।


 এসব বলে মহিলাটি নিজেই কাঁদতে লাগলেন আর বললেন, "আমি সম্পর্কে ওনার ছোট বোন হই।" শুনতে শুনতে কখন যে চোখে পানি চলে এসেছিল বুঝতে পারি নি। ততক্ষণে ট্রেন স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছে। ওনারা যখন নেমে যাচ্ছিলেন তখন বৃদ্ধা মহিলাটি আমার হাত ধরে চুমু খেলেন। আমি বললাম কিছু বলবেন? সে মাথা ঝাঁকিয়ে না করল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম শুধু। তবে তার সাথে কেমন যেন একটা টান অনুভব করলাম।


 আমি তার বোনকে আমার ফোন নাম্বারটা দিয়ে দিলাম। হয়তো কোনো সময় আাবার কাজে লাগবে। তারপর বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা নিয়ে বিদায় নিলাম।



এরপর প্রায় বছরখানেক কেটে গেছে। বাড়ি, বাড়ি থেকে ইউনিভার্সিটি, আরও নানা কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তাদের কথা তেমন আর মনে পড়ে নি। একদিন হঠাৎই এক অজানা নাম্বার থেকে কল আসে। জানতে পারি ওই প্রৌঢ় মহিলা নাকি খুব অসুস্থ। আমাকে দেখতে চেয়েছেন। আমি ঠিকানা খুঁজে গেলাম দেখতে। আমি যেতেই দেখি তিনি খুবই অসুস্থ। আমার হাত ধরে চুমু খেলেন। সে নাকি তার হারানো মেয়েকে আমার মাঝে খুজে পেয়েছেন। অতপর আরেকবার আমার হাতে চুমু খাওয়া অবস্থাই নিস্তেজ হয়ে পড়লেন। বুঝতে পারলাম প্রাণ পাখিটা আর নেই। এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন ওপারে। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করছিলাম। না জানি কত নিরীহ মায়ের বুক এভাবে খালি করে দিয়েছিল ওই নরপশুগুলো। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে হয়তো কারো কহিনীকে চাপা দেওয়া যায়। কিন্তু তা অনুধাবন খুব কম ব্যক্তিই করতে পারে। আর যারা তার জন্য দায়ী, তাদের কাছে তো বিষয়টা নিছক হাসিখেলাই.....





+লেখক: তাসনোভা তুশিন

 হলি ক্রস কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী, ভালোবাসেন ছবি আকঁতে।
ফেসবুক আইডি:আইডি লিংক