ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ছোটগল্পঃবিসর্জন - লিখেছেন - আশেকুল মোস্তফা আবরার


সূর্য ডুবেছে কিছুক্ষণ আগে। চারপাশটা পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে ওঠেছে। রান্নাঘরে একটিমাত্র কেরোসিনের কুপি। সেটা মিনমিন করে জ্বলছে। কুপির আলোতে রহিমা আলু কাটছে। তার মেয়ে সাদিয়া বই নিয়ে কুপির একদম পাশেই বসেছে। সে ঝুঁকে বই পড়ার চেষ্টা করছে। কুপির মিনমিন আলোতে দেখা যায় কি যায় না এমন অবস্থা! সাদিয়ার মুখে ঈষৎ বিরক্তিভাব ফুটে ওঠে। সে এবার পি এস সি পরীক্ষা দেবে। পড়াশোনায় খুব ভালো। তাদের ক্লাসে প্রথম। এই মেয়েকে নিয়ে রহিমার অনেক স্বপ্ন। তার স্বপ্ন সাদিয়া পড়াশোনা করে অনেক বড় ডাক্তার হবে। ভালো একজন স্বামীর ঘরে যাবে। যেখানে তাকে রহিমার মতো কষ্ট পেতে হবে না। কোনো কারণে সাদিয়ার পর রহিমার আর বাচ্চা হয় নি। তাই সাদিয়াকে ঘিরেই তার যাবতীয় আশা-ভরসা আর স্বপ্ন।
 
কুপি একসময় মিনমিন কিরে জ্বলতে জ্বলতে নিভে যায়। চারদিকে ততক্ষণে গাঢ় অন্ধকার হয়ে এসেছে। রহিমার আলু কাটা শেষ হয় নি।সে অন্ধকারে সাদিয়ার পাশে এসে বসে। সাদিয়া তার মায়ের কাঁধে মাথা এলিয়ে দেয়। দুজনে অন্ধকারে চুপচাপ বসে থাকে।

এর কিছুক্ষণ পরই জসিম ঘরে প্রবেশ করে। জসিম রহিমার স্বামী। সে দিনমজুরি করে। আয় করা প্রায় সব টাকা দিয়েই সে মদ খায়।রহিমা সেলাই কাজ করে, বাড়ির পেছনের খালি জায়গাটায় শাক-সবজি লাগায় আর কয়েকটা হাঁস-মুরগি পালে। এই কাজগুলো করে সে যা আয় করে তা দিয়েই মূলত স্বামী, বাচ্চা সহ তাদের তিনজনের সংসারটা কোনোমতে আধপেট খেয়ে চলে যায়। তার ওপর জসিম মাঝে মাঝে চড়থাপ্পড় মেরে কিছু টাকা মদ খাওয়ার জন্য নিয়ে নেয়। গত কয়েকদিন ধরে রহিমা সেলাই করার জন্য কাপড়ও পাচ্ছে না।তার হাত একদম খালি। যার কারণে কুপির জন্যে কেরোসিন টুকুও কিনতে পারে নি।

জসিম ঘরে প্রবেশ করে দেখে ঘরের ভেতরে গাঢ় অন্ধকার। আজও সে মদ খেয়ে এসেছে। ঘর অন্ধকার দেখেই তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। সে তার হাতে থাকা টর্চ লাইটটি অন করে রহিমার নাম ধরে ডাক দেয়। রহিমা তার ডাক শুনে তার কাছে আসে। কাছে এসেই রহিমা বুঝতে পারে তার স্বামী আজও মদ খেয়ে এসেছে। জসিমের মুখ থেকে ভকভক করে সস্তা বাংলা মদের গন্ধ আসছে। রহিমার মন খারাপ হয়ে যায়। তারা টাকার অভাবে ঠিকমতো খেতে পারছে না এমনকি কুপি পর্যন্ত জ্বালাতে পারছে না; তার ওপর জসিম এতগুলো টাকা নষ্ট করছে। সে শান্তভাবে জসিমকে কুপির জন্য কেরোসিন আনতে বলে। জসিম এমনিতেই রেগে ছিলো, রহিমার কথা শোনার পর যেন রাগে একেবারে ফেটে পড়ে। হঠাৎ প্রচন্ড বেগে জসিম রহিমার গালে চড় দেয়। চড় খেয়ে রহিমার মাথা ভনভন করে ঘুরে ওঠে। সে পড়ে গিয়ে চেয়ারের সাথে ধাক্কা খায়। তার কপালের বাম পাশে কেটে গিয়ে রক্ত বের হওয়া শুরু করে। সে ওভাবেই পড়ে থাকে। জসিম আরও কিছুক্ষণ অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে বেরিয়ে যায়।

সাদিয়া দরজার আড়াল দাড়িয়ে সব দেখছিলো। যদিও এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটে; তবুও তার মায়ের কপালে রক্ত দেখে সাদিয়া ভয় পেয়ে যায়। বাবা চলে যাওয়ার পর সে আস্তে আস্তে মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। আলতো করে তার মায়ের কপালে হাত রাখে। রহিমা নিজেকে সামলে নিয়ে ওঠে দাঁড়িয়ে রক্ত ধুয়ে ফেলে। তারপর সাদিয়াকে নিয়ে ঘুমোতে যায়। মা-মেয়ে জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে পড়ে।

সূর্য ওঠে।
আরেকটি নতুন দিনের সূচনা হয়। রহিমা অন্যান্য দিনের মতো নামাজ পড়ে ঘরদোর ঝাড়ু দেওয়ার মাধ্যমে দিন শুরু করে। সাদিয়াকে স্কুলে পাঠাতে হবে। সে রান্না ঘরে গিয়ে ভাত রান্না করে। ভাত বুদবুদ করে ফুটছে। সে ভাতের ওঠা ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। তার কপালে প্রচন্ড ব্যাথা করছে। কপালের বাঁ পাশে ফুলে আছে এখনও। জসিমের ওপর তার প্রচন্ড রাগ ওঠে। সে অনেকবার জসিমকে ছেড়ে দিয়ে তার বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা ভেবেছে। সেখানে গেলে সেলাই কাজ করে, হাঁস-মুরগি চাষ করে খেয়ে-পরে ভালোই চলতে পারবে। শুধু সাদিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে সে যায় না। আবার সাদিয়াকে নিয়ে চলে যাওয়ার উপায়ও নেই। স্বামীর হাতে এতো মার খেয়েও সাদিয়ার ফুটফুটে মুখের দিকে তাকিয়ে সে সব দুঃখ ভুলে যায়। তার ইচ্ছে সে সাদিয়াকে অনেক পড়াশোনা করাবে।একদিন তার সাদিয়া ডাক্তার হবে। সে সাদিয়ার জন্য শত নির্যাতন সহ্য করেও স্বামীর ঘর করবে। সব সুখ বিসর্জন দিবে। তারপর একদিন সাদিয়া ডাক্তার হওয়ার পর তার মুখের দিকে তাকিয়ে সে তার অতীতের সব দুঃখ ভুলে যাবে। তার চোখে সুখে আর স্বপ্নের ঝিলিমিলি খেলে যায়। তার কপালের ক্ষতটা হঠাৎ ব্যাথায় চিনচিন করে ওঠে। কপালের ব্যাথায় সেই স্বাপ্নিক চোখ থেকে দু'ফোটা অবাধ্য অশ্রু গাল বেয়ে বুদবুদ করে ফুটে ওঠা ভাতের ধোঁয়ার সাথে মিশে যায়।  




+লেখক: আশেকুল মোস্তফা আবরার
প্রচন্ড স্বপ্নবাজ। পৃথিবীকে গভীরভাবে দেখে, পড়ে আর অনুভব করে একজীবন কাটিয়ে দিতে চান।
ফেসবুক আইডি:আইডি লিংক