ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

এসো আবার - লিখেছেন - কবি স্বাধীন্দ্রনাথ


বসন্তের অপেক্ষা। কেবল ছিলো উত্তুরে বাতাসের শব্দ। কেমন জানি সব কুয়াশায় আচ্ছন্ন ছিলো। তারই ভেতর থেকে কোত্থেকে জানি নুপুরের ঘুঙুর ঘুঙুর আওয়াজ। দূর হতে দেখছিলাম তাহারই পড়নে লাল শাড়ি, চেহারাটা অতসী ফুলের মত,পায়ে আবার আলতাও দেখি, ছড়নো চুলগুলো থেকে এক অদ্ভুত ফুলের গন্ধ আসছে, কপালে একটা গাঢ় টিপও, ওমাহ! হাতে একগাদা আবার লাল চুড়িও। তার কালো চোখের অতল চাহনি আমাকে আকুল করে তোলে। কেশগুলো যখন আলুলায়িত করো, হাওয়ালাগা চারা গাছের মত আমি কেমন আন্দোলিত হয়ে ওঠি। তুমি যখন "এসো তুমি,এসো আবার" বলে কাছে ডাকো আবার কাছে যেতে না যেতেই যখন দূরে ঠেলে দাও।তখনই মনে এক বিব্রতকর প্রশ্ন জাগে, কে তুমি?
কেন আমাকে বারবার এই সংকটময় অবস্থায় ফেলছো আর কেনই বা আমার বুকে এক উত্তাল ঝড় বয়ে দিয়ে যাচ্ছো। তখনই মার কর্কশ কন্ঠে ডাক, "কিরে সুমন! আর কত ঘুমাবি, কলেজে যেতে হবে না। ওঠ!" কেমন কপাল আমার হায়রে। আমি এই মেয়েকে প্রায়ই স্বপ্নে দেখি, কেন যে দেখি তা আমি জানি না। কিন্তু যখনই আমি মেয়েটাকে দেখতে কাছে যাবো, তখনই কোনো না কোনো কারণে আমার ঘুমটা ভেঙেই যাবে। এটা কি ঐশ্বরিক নাকি ইচ্ছাকৃত তা আমি জানি না। হয়ত জানার চেষ্টা করিনি।

২.
বাপ রে বাপ! ঘড়িতে দেখি ৬ঃ৩০টা বাজে। সুদীপ স্যারের অন্তরীকরণ এর ক্লাস। ০.০০০১ সেকেন্ড দেরীতে গেলেও থাপ্পড় মিস যাবে না। তাই না খেয়েই শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে ব্যাগটা কাধে নিয়ে দিলাম আমি দৌড়। এমনেই বৃষ্টির সিজন আবার ওইদিকে রাতে ঘুমটাও ভাল হয় নি। তাই বাসের পিছনের সিটেই দিলাম আমি ঘুম। ঘুমটা ভাঙতেই দেখলাম, বাসটা একজায়গায় থেমে রয়েছে। কিন্তু বাসটা তো এখানে থামার কথা না তো। তাহলে থামলো কেন?

বিষয়টা পরখ করার জন্য জানালা দিয়ে মাথা বের করতেই বুঝলাম গাড়ির টায়ার পাংচার হয়ে গেছে। বাহির বের হতেই দেখি একদল যাত্রী অন্য বাসে উঠার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, কেও আবার ঘোরাঘুরি করছে, কতজন তো আবার ব্যাপক মনোযোগ দিয়ে গাড়ির টায়ার সাড়ানো দেখছে। আমি আবার পাশের দোকান থেকে এক কাপ চা নিলাম কারণ ঘড়িতে তখন ৮ টা বাজে। সুদীপ স্যারের ক্লাস তো এমনেই মিস, এখন গেলে থাপ্পড় ছাড়া কপালে আর কিছুই জুটবে না। চা খেতে খেতে দেখলাম কতগুলা বাচ্চা ছেলেমেয়ে দূরে নদীর ধারে কি যেন করছে!..কি করছে ওরা...
তাদের কাছে যেতে না যেতেই তারা কেউ নদীতে ঝাপ দিলো, কেউ আবার একটা দড়ি ধরে টানছিলো। কি সেই দড়ি...পরক্ষণেই বুঝলাম ওইটা আসলে একটা জাল। জালে একটা বড় মাছ বেধেছে। জালটা তুলতে সাহায্যের জন্য যেই হাতটা বাড়ালাম,
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা আচমকা ডাক,"ওইখানে তোগো কামডা কি?..ঘরে আয় তরতরি!"..
আমিও চকমকিয়ে উঠলাম, তবুও বাতাসে ভেসে আসা কোমল কন্ঠের আওয়াজটা কেমন জানি মনের দরজায় কড়া নাড়লো।

সময়টা যেন থমকে গেলো। পরক্ষণেই মনে পড়লো, বাংলার আনিতা ম্যাডামের কথা, উনি বলেছিলেন,"এই বয়সটা উড়ু উড়ু, যাকে দেখবে তাকেই ভাল লাগবে। আসলে তাইতো, ওইদিনও তো কলেজের সামনের রাস্তাটায় এইরকমই একটা মেয়েকে দেখে ভাল লাগছিলো। আচ্ছা,এই মেয়েটার পায়ে কি আলতা ছিলো..?

বৃষ্টি হয়েছিল তো তাই সব ভেজা। তাই মেয়েটা যেখান দিয়ে হেটে আসছিলো ঠিক ওইজায়গায় আলতার ছাপ পড়ে আছে।কেমন জানি দেখতে অনেকটা লক্ষী পুজায় মা ঘরে যেমন আলপনা দিতো ওইরকম লাগছে।দেখলাম এমতাবস্থায় একটি ছোট্টছেলে হাতের আঙ্গুলটা ধরে ডেকে বললো,"শরীরডা ভিজা দেহি, বাড়িত আহেন, মুইচ্ছা লইয়েন আর ইয়া বড় মাছও ধরছি,খাইয়া যাইয়েন!"..
আমি আর না করে একদম বাচ্চার মত তাদের পিছ পিছ অনুসরণ করতে করতে তাদের বাড়িতে গিয়া উঠলাম।বাড়িতে যাওয়া মাত্রই উনুনের ঘর থেকে সেই আলতা পড়া মেয়েটা গামছা আর মোড়া নিয়ে আমার সামনে উদীয়মান হলো। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে..মেয়েটাকে তবুও কেন জানি চেনা চেনা লাগছিলো। কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। মনটা অস্থির হয়ে উঠলো। সেই পরিচিত চাহনি..সেই পরিচিত গন্ধ। তাও চিনছি না। ঠিক তখনই কোত্থেকে এসে হেল্পার দূর থেকে ডাক দিয়া বললো.,"মামা,আইয়া পড়েন। গাড়ি ঠিক হইয়া পড়ছে! "গামছা টা দিয়ে যেই রওনা দিবো..ঠিক তখনই রজনীগন্ধার বোটার নত ঈষৎ নত হয়ে যখন দাড়িয়ে মেয়েটি আমাকে বললো!.."এবার এসো, তুমি এসো আবার"।

পরক্ষণেই আমার সমস্ত রক্ত যেন মিছিল করে উজানে বয়ে যেতে লাগলো। আরে এই মেয়েকে তো আমি চিনি। আমি আর এই মেয়েটি ছাড়া সবকিছুই যেন ঝাপসা হয়ে গেলো। একে তো আমি চিনি..এই তো সেই মেয়ে যাকে আমি প্রায়ই স্বপ্নে দেখতাম।
তখনই চেতনার স্তরে স্তরে উৎসবের সাড়া পড়ে গেল। আচমকা আমি চিতকার দিয়ে বলে উঠলাম, "আমি পেয়েছি,পেয়ে গেছি"।
আমি যে দাড়িয়ে থাকবো তার উপায় কই, সামনে যে পা ফেলবো তারও শক্তি নেই। নিজের উচ্চারণে নিজেই চমকে গেলাম। একি বলছি আমি! সামনে তুমি দাঁড়িয়ে। আমার মনে হলো, তুমি আসবে বলে, এসে এমনি দাঁড়াবে বলে কতকাল তোমার প্রতীক্ষায় আমি অধীর ছিলাম। আজ তুমি এসে গেছো।.. চোখ থরথর করে কাঁপছে। শরীর থেকে সুঘ্রাণ বেরিয়ে আসছে। বহুকাল আগে বিস্মৃত একটি স্বপ্ন যেনো আমার সামনে মূর্তিমান হয়েছে! সেইদিনকার পর থেকে আমি আর ওই মেয়েকে স্বপ্নে দেখি নি...  


+লেখক: কবি স্বাধীন্দ্রনাথ
বায়োতে ভালো কিছু খুঁজে না পেয়ে, নিজেকে চঞ্চল চৌধুরী দাবি করে বসেছেন।
ফেসবুক আইডি:আইডি লিংক