ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

শেষ উপহার - লিখেছেন - হোসাইন মুনতাসির


চারিদিকে টিপ টিপ বৃষ্টি।
হাল্কা বাতাসও বইছে। পাড়ার ছেলেরা আম কুড়োতে বের হয়েছে। কারো হাতে লাইট, কারো হাতে ফোনের ফ্ল্যাশ। চারদিকে বৃষ্টি বাড়ছে। বাতাসও ঘন হচ্ছে।

আজ অদ্রীর আবেদনের চাইতে আক্ষেপই বেশি। নিলয় সারাদিন অফিস করে বাসায় আসে। ক্লান্তিতে বউয়ের মুখ ভারের কারণটাও জানার ইচ্ছা জাগে না। তাড়াতাড়ি ওয়াশ্রুমে ফ্রেশ হতে চলে যায়।
অদ্রী ভাবে। ভাবে চার বছর আগে ওভাবে পালিয়ে বিয়ে করাটা কি ঠিক হয়েছিলো ?
যদিও পালিয়ে বিয়ে করার  ইচ্ছাটা তখন অদ্রীরই বেশি ছিলো। অদ্রী জানে তার পরিবারের পছন্দের ছেলের সাথে নিলয়ের তুলনা করলে পরিবারই জিতবে। কারণ, এইসব তুলনায় তো আর ভালোবাসা নামক শব্দটির স্থান নেই। পরিবারে কথা শুনলে অদ্রী হয়তো আজ কানাডায় থাকত।
অদ্রী ভাবে নিলয় হয়তো তাদের বিবাহ বার্ষিকীর কথা ভুলে গেছে। কি করবে বেচারা আর?
সারাদিন বদমেজাজি বসের দেওয়া খাটনি খেটে, আসলে মস্তিষ্কটা ঠিক মতো কাজ করার কথাও তো নয়। তার উপর ফ্ল্যাটের বিশাল অঙ্কের লোন। সুখের সাথে আজকাল যে অর্থেরও গভীর সম্পর্ক, সেটা হয়তো সবাই বুঝে উঠতে পারে না। নিলয় বুঝেছে, তাই তো অনেক খাটছে। কিন্তু একটু দেরি হয়ে গেছে।
এই সাধারণ চাকরিটাও পেতে তার ২ বছর লেগেছে। আজকাল চাকরির বাজার বেশ চড়া। মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়া কীছুই হয় না। নিলয় বিবাহ বার্ষিকী ভুলেছে ঠিকই। গত সপ্তাহেও তার প্ল্যান ছিলো অদ্রীকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার। অথচ আজ সে ভুলে গিয়েছে ।

অদ্রী কালো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পূর্ণিমার চাঁদকে খুঁজছে। নিলয়ের ঐ দিকে মনোযোগ নেই। এসবে এখন আর তার আবেগ জাগে না। নিলয় ১১টার অপেক্ষাইয় টিভি ছেড়ে বসেছে। বার্সেলোনার খেলা বলে কথা। ছেলেটা খেলা প্রিয়। আড্ডা প্রিয়। তবে এখন আর আড্ডা দেওয়ারও সময় হয় না। রাতের খেলাটাই এখন একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম।

অদ্রী ঘুমোতে চলে যায়। অদ্রীর মনে তীব্র আক্ষেপ। শুধুই কি আক্ষেপ! তীব্র অভিমানও। ছেলেটা ভুলে গেলো কি করে। অদ্রী নিজেকে সান্তনা দেয়। এখনো তো ১ ঘন্টা বাকি। এর মধ্যেও যদি নিলয় একবার Wish করে তাহলে তার সকল অভিমান চলে যাবে। মেয়েটার চাহিদাতো বেশি না। আর সেটা বুঝতেই হোচট খায় নিলয়। অথচ নিলয় এমন ছিলো না। আগে তিন চার দিন দেখা না হলেও তার চাহিদা ঠিকই বুঝতো নিলয়। অথচ এখন এক ছাদের নিচে থেকেও বুঝে না। কতো তাকে বাইকের পিছনে করে ঘুরিয়েছে।
ওই ২ বছর যে নিলয় শুধু চাকরির পিছনে ঘুরেছে এমনটা নয়। অদ্রীর পিছনেও ঘুরেছে সে।
 
অদ্রী শুতে গিয়ে মুখ ভার করে ভাবে মাতৃত্বের স্বাদটা যে সে পেতে যাচ্ছে , ওটা সে জানে। নিলয়কে তো বলা হয়নি। বলবেই বা কি করে? গত সপ্তাহেই তো জানলো। ভেবেছিল বিবাহ বার্ষিকীতে সারপ্রাইজ দিবে নিলয়কে। কিন্তু সে তো ভুলেই গেলো। রাগ আর অভিমানে ঘুমিয়ে পড়ে অদ্রী।
 
ঘুমানোর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ঢুঁ মেরে আসার অভ্যাস নিলয়ের। ঢুকতেই দেখে On 15th May,4 Years ago ; শিরোনামে একটা সুন্দর ছবি তাকে পাঠিয়েছে ফেসবুক মহাশয়। দেখেই বুঝত্রে পারে কিছু একটা গন্ডোগোল ঘটে গেছে।
তাড়াতাড়ি ঘড়িতে দেখে, ১টা ১৬ বাজে তখন।
দুঃখ আর ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য তাড়াতাড়ি অদ্রীর কাছে যায় সে। কিন্তু অদ্রী ততোক্ষণে গভীর ঘুমে। নিলয় জাগালো না তাকে। সেও একটা প্ল্যান করে। একটা বড় চিঠি লিখে সে। লিখতে সে ভালোবাসে। কিন্তু এখন আর সে সময়টা পায় না।
আজ সময় ও সুযোগ দুটোই পেয়েছে। তাই সুযোগটা সে হাতছাড়া করে নি। আর ৩ মাস আগের পছন্দ করা টিকলিটাও বের করে ব্যাগ থেকে। তখন টাকা ছিলো না তাই কিনতে পারে নি। গত মাসেই কিনেছে ওটা।

সকালে উঠে নিলয় সব ঠিকঠাক করে সাজিয়ে অফিসের দিকে রওনা দেয়। অদ্রীকে সে জাগায় নি। চেয়েছে সে নিজে থেকেই উঠে তার Surprise Gift টা খুঁজে পাক।

সকাল ৯ঃ৪২

একটা Unknown নাম্বার এর কলে ঘুম ভাঙ্গে অদ্রীর।
অদ্রী Surprised হয়েছে ঠিকই,তবে সেটা নিলয়ের বাইক এক্সিডেন্টের কথা শুনে..।
নিলয়ের বাইকই শুধু নিয়ন্ত্রণ হারায়নি, নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে অদ্রীর জীবনও। নিলয়ের হয়ত জানাই হলো না যে, সে দুটো প্রাণকে রেখে গেছে।

অদ্রী ভাবে; ভাবতে ভাবতেই প্রতিদিন সূর্যোদয় দেখে। ভাবে, লাইফ ইন্সুরেন্সের টাকা দিয়ে কি আর ভালোবাসার মানুষের অভাব ঘুচানো যায়?
 
সিঁদুর ছাড়া টিকলিটাও এখন আর আগের মতো মানায় না।
অদ্রী ভাবে, তার ভাবনার অন্ত নেই যে!  


+লেখক: হোসাইন মুনতাসির
সাহায্য করতে ভালোবাসেন। জাতীয় রাজনীতিতে আগ্রহী।

ফেসবুক আইডি:ফেসবুক আইডি লিংক