ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

জীবন পরিক্রমা - লিখেছেন - মোবারক ইবনে মনির


স্কুল জামা পরাবস্থায় ঘর থেকে বেরিয়ে গেল রুবি। পাশের বাড়ির বান্ধবী নিপাকে নিয়ে বিলে গেল শাপলা তুলতে। মফিজ মিয়ার নৌকা। যে ব্যক্তি কাউকে এই নৌকার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখলেই শুরু করে দেয় চৌদ্দগুষ্টিসুদ্ধ গালাগালি, তার নৌকা নিয়েই পালালো ওরা দুজন। সুযোগ আবার কে হাতছাড়া করে!


মফিজ মিয়া তার ছেলে সুমনকে খুঁজতে গেছে। বয়স চল্লিশ পার হচ্ছে সেদিকে সুমনের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। একদিন কাজ করে যে টাকা পায় সে টাকা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর কোন কাজে যায় না। তবে সে এখন তাস খেলায় ব্যস্ত। এখন এটাই তার প্রধান কাজ। বলতে গেলে প্রিয়ও বটে। বউ- ছেলেমেয়ে- সংসারের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নাই। অসময়ে এসে খাবার খেয়ে যায়। খাবার না পেলে বউ ছেলে মেয়েকে মারধর করে চলে যায়। কী এক অদ্ভুত কাণ্ড!


মা মরেছে বেশ কিছুদিন হয়েছে। মায়ের শাসনে ভালোই ছিল। কাজ কাম করতো। চলে যাবার পরে বখে গেল। এই বয়সেই। উদাস ভাবে ঘুরে বেড়ায়।



মফিজ মিয়া পুরো গ্রাম তন্নতন্ন করে খুঁজে কোথাও না পেয়ে অগত্যা বাড়ীর পথ ধরলো।
হতচ্ছাড়া আজকে তুই বাড়ি আয়! বউ পোলাপান না খাইয়া মরতাছে আর তুই উল্লাস কইরা টাকা-পয়সাও উড়াইতাছোস। পোড়াকপাল, দেখিস আজকে তোর বাড়ি থেকে না তাড়াইছি আমার নাম মফিজ না! বাড়ি ফিরতে ফিরতে পথে কথাগুলো বলছিল।


২.
রুবির মা আফরোজা বেগম হালকা পাতলা দেহের মধ্যবয়স্কা নারী। রুবিকে ঘরে না পেয়ে বলছে, মেয়েটার বিয়ের বয়স হয়েছে এখনো পোলাপানের মত বিলে-ঝিলে ঘুইরা বেড়ায়।
বিয়ের বয়স বলতে সবেমাত্র ১৪ শেষ হলো। কৈশোরের দুরন্তপনা এখনো ছাড়তে পারেনি। মাঝেমধ্যেই কোথায় চলে যায় কে জানে! কখনো আবার হঠাৎ করে কতগুলো শাপলা, কলমী শাক এনে ঘরের দুয়ারে ফেলে রাখে।



আজকের রান্নার কুমড়োর পাতা আর টাকি মাছের জোগাড় করা রুবিরই। বাড়ির পেছনে পুকুর পাড়ে গাছটা বড় হওয়ার পর ওর নজরে পড়ে। পানি ও বেড়া দিয়ে বড় করেছে। লতা পাতা একটু বড় হতেই পাতাগুলো ছিঁড়ে নিয়ে এসেছে রান্নার জন্য।


বিদেশগামী পিতা। অভাবের সংসার থেকে কিছু জোগাড় করে আর ঋণ নিয়ে দরিদ্র এক রাষ্ট্র ওমেন যায়। কাজকাম কম। মাস পাঁচেক পর ১০/১৫ হাজার টাকা পাঠায় । তা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতেই শেষ হয়ে যায়। আর সংসার টিকে আছে নুরুর সমবয়সী ভাইয়ের ট্রাক ড্রাইভারির উপর ।



নিপা বলল, এতক্ষণে মনে হয় বুড়ো নৌকা না পেয়ে গালাগালিতে গ্রাম কাঁপিয়ে দিয়েছে। আজ গালি শোনার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকিস। নীপার কথায় রুবি কিছুটা ঘাড় ফিরিয়ে শুনলো। তারপর বলল, রোদের তেজ বেড়ে যাচ্ছে। নৌকা বাড়ির দিকে নিয়ে চল। কিছুক্ষণ পর নিপা বলল, আমাদের গ্রামের পশ্চিম পাড়ার ছেলে জুয়েলকে চিনিস? রুবি বলল, নাম শুনে তো চেনা যাচ্ছে না দেখলে হয়তো চিনতে পারি।
নিপা বলল,ওই যে হালকা ফর্সা করে মোটামুটি স্বাস্থ্য, চিনতে পেরেছিস?
- দেখেছি হয়তো তবে ওভাবে অত করে চিনি না। কেন কি হয়েছে?
-না এমনিতেই।
-এমনি কি আবার, কিছু হয়ে থাকলে বল।
-তেমন কিছু না, বোধহয় ছেলেটা আমাকে পছন্দ করে, আমাকে দেখলেই কেমন যেন ক্যাবলার মত হা করে তাকিয়ে থাকে।

রুপার কথা শুনে রুবি সশব্দে হেসে উঠলো। নিপা লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলল, হাসার কি আছে?
-না কিছুনা, কিন্তু তুই যেভাবে বললি ক্যাবলার মত হাঁ করে তাকিয়ে থাকে এতে একটু হাসি পেল। রুবি আবার বলল, তো ছেলেটা তোকে ভালোবাসা-টালোবাসার কথা কিছু বলেছে, না শুধু হাঁ করেই দেখে? রুবির আবার হাসি।
-না, এখনও তেমন কিছু হয়নি তবে মনে হচ্ছে কিছু দিনের মধ্যেই হয়ে যাবে। আমার ভিতরটা কেমন কেমন জানি করে, বুঝলি!


নিপা আর কিছু বলল না। এতক্ষণে ঘাটে নৌকা ভিড়েছে। ওরা দুজন গালি শোনার অপেক্ষায়। কিন্তু কোন আওয়াজ পাচ্ছে না। নিপা ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল মফিজ মিয়া উদোম গায়ে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে।

৩.
রুবি রান্না ঘরে ঢুকে দেখল চুলোয় আগুন জ্বলছে। ভাতের পাতিল বসানো। রুবি ওর মাকে দেখলো ঘরে কাদের সাথে যেন কথা বলতেছে। ও সেদিকে লক্ষ্য না করে হাত পা ধুতে গেল। আর শাপলাগুলো রান্নাঘরে ফেলে রাখল। হাত মুখ ধুয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই একজন অল্পবয়স্ক আর দুজন বেশি বয়স্ক লোক দেখতে পেল। দেখে কোন আত্মীয় মনে হচ্ছে না। তবে তাদের সাথে রুবির মামা আছেন। কিছুক্ষণ পর রুবিকে দেখানোর উদ্দেশ্যে ওর মামা তাদের সামনে নিয়ে দাঁড়া করালো। লোকগুলো ওকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। বেশি খাটো না। রুবির স্বাস্থ্য মোটামুটি। দেখতে সুন্দর না হলেও মায়া মায়া ভাব স্পষ্ট। ভালো লাগবারই কথা। তাদের পছন্দ হলো। যাবার সময় বলল, ছেলের ভালো লাগলে সামনের সপ্তাহেই বিয়ে সেরে ফেলবো। যদি আপনাদের কোন আপত্তি না থাকে। মামা বলল, আমরা আপনাদেরকে দ্রুত জানাবো, কোন চিন্তা করবেন না। একথা বলে রুবির মামা তাদেরকে নিয়ে চলে গেল।


খুব সংক্ষিপ্ত আকারে ঘরোয়া আয়োজনে দ্রুত বিয়ের কাজ সমাপ্ত হলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বধু সেজে অন্যের ঘরে উপস্থিত রুবি। কেননা ছেলের ভালো বংশ এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়েও স্বচ্ছল। যার কারণে কেউ আপত্তি করেনি। তাই ওর বাবার অনুপস্থিতিতেই বিয়েটা হয়ে গেল।



৪.

থানা শহরে একটা মুদির দোকান আছে রমিজের। লম্বা উঁচু হালকা পাতলা দেহের কালো গাত্রবর্ণে সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখ। দোকানের কাজে সহযোগিতার জন্য অল্প বয়সী কর্মচারী রাতুল। এই দোকানের আয় দিয়েই ভালো চলে সংসার। শাশুড়ি যেমন হয়ে থাকে বলে আমরা মনে করি রুবির শাশুড়ি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। চুপচাপ, চতুর স্বভাবের। রুবির এখনো অকালবুদ্ধি। যা রমিজের জন্য খুবই ভালো। সামান্য থেকে সামান্য বিষয় নিয়ে রমিজের সাথে অভিমান করে। বেশি ভালোবাসে হয়তো! এ জীবনে আগে কাউকে ভালোবাসার কিংবা প্রেম করার সুযোগ হয়নি। ইচ্ছেও ছিল না। এজন্য একটু বেশি ভালোবাসে। রমিজ বিরক্তবোধ করলেও অভিনয়ের মতো সব মেনে নেয়। তবে রুবি তা বুঝে না। মাস তিন পার হয়ে যাচ্ছে তবুও রুবির বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে জাগে না। ওর মধ্যে সর্বদা গর্ববোধ কাজ করে। কারো সাথে কথা বলে না। আসলেই মানুষের অবস্থা ভিন্ন হয়ে আসলে মানুষ তার অতীত ভুলে যায়।



এতদসত্ত্বেও পাশের বাড়ির মহিলাদের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। তারা ওকে শুনায় তাদের জীবনের তিক্ত অনুভূতির গল্পগুলো।



৫.

বাবার চাকুরীর সুবাদে ঢাকাতেই থাকা হতো রাহেলাদের। এই শহরেই শৈশব থেকে বর্তমান যৌবনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ঘোরাঘুরি আড্ডা সবই হয় দেদারছে। ধনাঢ্যতার গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যেতে লাগলো ওদের সুখময় জীবন। গ্রামের এলাকা থেকে উঠে আসলেও এখন তারা আধুনিক পরিবার। আশরাফুজ্জামান সাহেব নিজস্ব ফ্ল্যাট কিনে সেখানে থাকেন। ধরতে গেলে স্থায়ী। আর ঢাকায় স্থায়ীভাবে বাস করাটাই তার একান্ত ইচ্ছা। ঢাকায় বাড়ির জন্য জায়গা কিনতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল তবুও চক্ষুলজ্জার খাতিরে মানিয়ে নিয়েছে। ছেলেমেয়েদেরকে নামিদামি স্কুল-কলেজে পড়িয়েছে।



রাহেলা দেখতে যথেষ্ট স্মার্ট, ফর্সা এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। বাপের টাকায় প্রাইভেট ভাবে পড়ালেখা করে। এর মধ্যে মাহিন নামের এক ক্লাসমেটের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। খুব গভীরভাবে। তবে ছেলেটা ওকে তেমন সুযোগ দেয় না। কারণ মাহিনের সমাজে জনপ্রিয়তা আছে। গান গায়। পার্ট টাইম অভিনয়ও করে। রাহেলা ওকে খুব করে চাইলেও মাহিন তেমন সময় দেয় না। কারণ রাহেলার মত হাজার ভক্ত রয়েছে। এই এক রাহেলার প্রেমে মজে তার কোন লাভ নেই। এমন কত রাহেলা আসবে যাবে তার কোন ইয়ত্তা নেই। কিন্তু হঠাৎ করে মাহিনের সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যায়। রাহেলাকে সময় দেয়। রাহেলা বুঝতে পারেনা এবং জানতেও চায় না, কেন তাকে কাছে টানছে, এত অবহেলার পরেও। তবে ও খুব আনন্দিত উৎফুল্ল উচ্ছ্বাসিত। ওরা এখন প্রায় একসাথে ঘুরতে বেরোয়।একদিন মাহিন ওকে তার সাথে প্রোগ্রামে যাওয়ার অফার দেয়। সেখানে তারা দু-তিন দিন থাকবে। রাহেলা অফার পেয়ে নিঃসংকোচে রাজি হয়ে যায়।



৬.

ঢাকার বাইরে দু-তিনদিন ঘুরতে যাওয়ার জন্য তার বাবা আশরাফুজ্জামান এর কাছে অনুমতি চায়। তিনি প্রথমে অনুমতি না দিতে চাইলে জোর করে চলে যায়। আশরাফুজ্জামান সাহেবের আর কিছু বলার থাকে না। রাতে ওরা ওদের প্রোগ্রামের কাজে হোটেলে ওঠে। সকাল থেকেই সব আয়োজন শুরু হবে। তাই সবাই দেরি না করে ঘুমিয়ে যায়। মাহিন রাহেলাকে তার সাথে থাকতে বলে। কিন্তু সে এড়িয়ে যায়। কিছু মনে করে না। কারণ প্রেমিক প্রেমিকার কাছে এমন আবদার করতেই পারে! তাতে দোষের কি! পরের দিন ভালোই কাটলো। রাতে আড্ডা দিয়ে যে যার রুমে চলে যাচ্ছে। মাহিন তার সাথে থাকতে বলছে কিন্তু রাহেলা কিছুতেই রাজি না হলে ওকে ভয় দেখায়। নানান হুমকি দেয়। এখন ওর কাছে মাহিনের আসল রূপটা প্রকাশ পেয়ে যায় এবং এই প্রেমের কারণটাও বুঝতে বাকি রইলো না।



অবশেষে যখন মাহিন আপারগ হল। এতে তখন ওর ক্ষোভ আরো বৃদ্ধি পেল। এদিকে রাহেলা কোনরকম নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকালে বাসায় ফিরে এলো। কাউকে কিছু জানায়নি। কি আর হবে এমন কিছু তো হয়নি! কিন্তু দিন কয়েক পরেই রাহেলার জীবন আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা দিল। ঘটনা ঘটে গেল উল্টোটা। ওকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য মিথ্যা ঘটনা প্রচার করতে লাগলো। যা কখনো কল্পনাও করেনি। এই ঘটনা বাবা-মায়ের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে কাল বিলম্ব হলো না। এসব শুনে আশরাফুজ্জামান সাহেবের চোখ কপালে উঠে গেল। তিনি বিষয়টাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বহুৎ টাকা-পয়সা খরচ করলেন। রাগে-ক্ষোভে নিজের মেয়েকে কিছু বলতে পারলেন না। তাই তিনি রাহেলাকে তাদের সেই গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন এবং তাড়াহুড়া করে সাধারন এক ছেলের সাথে বিবাহ দিয়ে দিলেন। এমন এক ছেলে যার সাথে সংসার করা জন্য রাহেলা কখনোই প্রস্তুত ছিল না। নিজের অপরাধের দিকে তাকিয়ে মেনে নিতে হলো সবকিছু। তার সামান্য ভুলের জন্য আজ সে বাবা-মায়ের কাছে অবিশ্বাসী। রাহেলা তার সেই কষ্টের কথাই শোনাচ্ছিল রুবিকে।



৭.

রাহেলার জীবন কাহিনী শুনে রুবি কিছুটা বিষণ্ন হলেও অনেক কিছু বুঝে আসলো না। ভাবে মানুষ কেন এমন হয়! জীবনটা কেমন যেন রহস্যময়। কার সাথে কি ঘটে যায় সবই অজানা। রমিজ বর্তমানে খুব ব্যস্ত দেখাচ্ছে। দোকানেই বেশি সময় কাটায়। আগের তুলনায় এখন ফোনের কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে। রুবি এতে কিছু মনে করে না। কারণ ও যা করে তা তো ওদের ভবিষ্যতের জন্যই। রমিজ রুবিকে কিছু বুঝতে দেয় না। কিন্ত ওর মধ্যে পরিবর্তন গুলো রুবির চোখে এড়ায় নি। কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে কথাগুলো না শোনার ভান করে যেন না নিতে হয়। এত ব্যস্ততার কথা জানতে চাইলে নানা অজুহাত দেখায়। রুবি কিছু বলে না। চুপচাপ মেনে নেয়।



মাঝেমাঝে দোকানের কর্মচারী রাতুল বাড়িতে বাজার দিতে আসলে জেনে নেয় রমিজের সব খোঁজখবর। আসলে কি ব্যস্ত না ওর কাছে ব্যস্ততা দেখায়? রমিজ আগের মতোই স্বাভাবিক, তবে বাড়ি দেরিতে ফিরে। বাহিরে সময় দেয়। এটা নিয়ে ঝগড়াও হয়েছে। কিছুদিন ভালো থেকে আবার আগের মত হয়ে যায রমিজ। এখন রুবি নানা সন্দেহে ভুগে। ওর এই ভাবনা ওকে অনেক কিছু শেখায়, বাস্তবতা বুঝতে সহায়তা করে। আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠছে হেয়ালিপনা। কিন্তু অনেক সময় পার করে ফেলেছে, বুঝতে খুব বেশি দেরী করেছে। ফিরতে পারছে না পিছু পথে।



পিছে তাকালেই ওর ফ্যামিলির টানাপোড়া অবস্থা চোখে ভাসে। ওর মায়ের কাছে বিষয়গুলো শেয়ার করলে বলে- সংসারে এমন হয়ে থাকে। তখন আর রুবির কিছু বলার থাকে না। নিজের ব্যথাগুলো বুঝারর আর কেউ থাকে না।



দিন যাচ্ছে রুবির চিন্তা-ভাবনা বাড়ছে। দিন যাচ্ছে ভিন্ন কিছু অনুভব করছে। দিন যাচ্ছে কারো অস্তিত্ব টের পাচ্ছে। দিন যাচ্ছে রমিজকে চিনতে শুরু করছে, প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে অতীত কাহিনী। দিন যাচ্ছে রমিজের সাথে মনোমালিন্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিন যাচ্ছে রমিজের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলছে।



এতদিন পর জানতে পারল রমিজের প্রথম সম্পর্কের কথা। কিছুদিনের সংসারের কথা। যা রুবিকে বিষিয়ে তুলছে। মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। এমন বেঈমানি না করলেও পারতো। বিয়ের সময় বলে নিলেই হত! ইচ্ছে হলে আসতাম নইলে আসতাম না। রুবির এই ক্ষোভ আরো ফাটল সৃষ্টি করে। ওর শাশুড়িই এই কাজ করেছে। তিনি প্রকাশ করেন নাই যাতে তার ছেলে পুরনো স্মৃতি ভুলে নতুন স্ত্রী নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাকে নিয়েই মেতে থাকে। অতীত ভুলতে সাহায্য করে। কিন্তু এখন তা হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে।



পরিশিষ্টঃ বাস্তবতা আর আত্মহংকার মাতৃত্ব ভুলে গেল। পিতৃত্ব অন্য নারীর নেশায় বুদ হয়ে নিজ সন্তানকে চিনলো না। পথ দুদিকে চলে গেল। মাঝপথে পড়ে থাকল শিশু মেয়েটি। মা গ্রহণ করেনি নি সন্তানকে নতুন স্বামী পাওয়ার আশায়। বাবা গ্রহণ করেনি অন্য নারীর সাথে মানিয়ে নিতে পারবে না বলে কিংবা যদি ওকে বিবাহ করতে না চায় সে স্বার্থে। কোথায় মনুষ্যত্ব! দুজনেই সুখে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু মেয়েটাকে গ্রহণ করছে দাদি। তার একটা ভুলের মাশুল তাকে গুনতে হচ্ছে। পারেনি স্বার্থ ভুলে নাতনিকে দূরে ছুড়ে ফেলে দিতে। নিজের খাবার জোগাড় করতে পারুক বা না পারুক দিনশেষে অবুঝ বাচ্চার মুখে কিছু তো তুলে দিতে হবে। যে সামান্য টাকা দিয়ে নিজের দিন গুজরান করত সেখানে একটা বাচ্চার চাহিদা কিভাবে পূরণ করবে! যেখানে ভেবে দেখে নি পিতা, ভেবে দেখেনি মাতা! স্বার্থপরতার জয় হয়েছে, মুক্তি পেয়েছে মানবতা। আর একটা মেয়ে বড় হচ্ছে মাতৃহীন অনাদরে; পিতৃহীন পরিচয়ে। কেমন হবে ওর ভবিষ্যৎ! সংসার! জীবন! যৌবন! মৃত্যু!




লেখকঃ মোবারক ইবনে মনির

বাস্তবতার সন্ধানে বই পড়া। সময়ে-অসময়ে একাকী পথ হাঁটা। গান শুনতে ভালোবাসা। আর একজন আপাদমস্তক ইসলাম প্রেমিক।