ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীঃমেটাল ইগো - লিখেছেন - আনাস রোহান




দেশের সর্ব উত্তরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি বিশাল প্রান্তর।
প্রান্তরের উত্তর দিকটায় কোনো গাছপালা নেই, পশ্চিম দিকে একটি ছোটো হ্রদ, হ্রদের অপর পাশে একটি উচু টিলা, পূর্বে ছোটো তরুলতায় আচ্ছাদিত মাঠ।
প্রান্তরের উত্তর দিকের গাছপালাহীন মাঠ অতিক্রম করে দক্ষিণ দিকের গাছপালা আচ্ছাদিত মাঠের দিকে হেটে চলেছে নিরাপত্তা বিভাগের ২ জন কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে বয়সে যিনি বড় তার নাম শাহেদ, আর অপরজনের নাম প্রত্যয়। শাহেদ নিরাপত্তা বিভাগের অল্প কিছু মানব কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন যিনি, কারাগারের বন্দীদের ব্যাবস্থাপনায় নিয়োজিত। প্রত্যয় নিরাপত্তা বিভাগে, অপরাধীদের কেস স্ট্যাডি করে এবং "মাল্টিভ্যাক প্রাইম-৭" কে রিপোর্ট করে। দুটি ভার্শন-২ হিউম্যানয়েড রোবট "ম্যাগ-২৩", প্লাজমা ক্যানন নিয়ে তাদের সামনে পথ ধরে দক্ষিণে এগিয়ে চলেছে।


"মাল্টিভ্যাক প্রাইম" হলো ৭ম প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফাজি লজিক, এক্সপার্ট লার্নিং সিস্টেমের সমন্বয় ঘটিয়ে  দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। দেশের সব বিভাগের নিরাপত্তা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মাল্টিভ্যাক। সকল মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য থেকে শুরু করে অন্যসকল তথ্য মাল্টিভ্যাকের সার্ভারে জমা থাকে। সেখানে জমা তথ্যের উপর ভিত্তি করেই একজন মানুষকে দেশের সকল সুযোগ সুবিধা দেয় হয়। সরকারের উচ্চস্তরের সকল প্রতিনিধির নিরাপত্তা, ব্যাংক ব্যবস্থা, কারাগারের বন্দীদের ব্যবস্থাপনা তথা সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নিরাপত্তা বিধান করাই এটির কাজ।

পুরো দেশ এটির উপর এমন ভাবে নির্ভরশীল হয়ে গিয়েছে যে, এটি বন্ধ হয়ে গেলে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাথে সাথে হুমকির মুখে পড়বে।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভরশীলতার কারনে নিরাপত্তা বিভাগে, পুলিশ বিভাগে মানব কর্মচারীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে।তাদের জায়গা করে নিয়েছে রোবটরা।
হিউম্যানয়েড ভার্শন -৭, রোবটগুলো কেন্দ্রীয় কারাগার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নিরাপত্তার কাজ করে। আর তাদের থেকে নিচুস্তরের রোবটরা কারারক্ষী হিসেবে কাজ করে। পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি এমন নিশ্ছিদ্র যে, দেশের অপরাধের পরিমান অতীতের তুলনায় অনেক হ্রাস পেয়েছে। কোথাও অপরাধ সংঘটিত হলেই মাল্টিভ্যাক তথ্য উপাত্ত নিয়ে কাজ করে প্রধান ডেটা ডেন্টারের তথ্য নিয়ে অপরাধী কে ধরে ফেলে। সরকারের উচ্চপদস্থ ৫ জনের একটি দল, এই মাল্টিভ্যাককে নিয়ন্ত্রণ করে।
মাল্টিভ্যাকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এতই উঁচুস্তরের যে, একে মানুষের সমতুল্য বলে গন্য করা হয়। গতবছরের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে, প্রাইম-৭ কে "মানবসত্ত্বা" হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে আসতে শাহেদ বা প্রত্যয়, কারোই ইচ্ছা ছিলনা। কিন্তু গতকাল একটি অকল্পনীয় ঘটনা ঘটে গেছে।
কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে একজন খুনের আসামী পালিয়ে গেছে। মাল্টিভ্যাকের নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে কেউ পালাতে পারে, এটি ভাবাও অসম্ভব।
দেশের সকল মিডিয়া এ ঘটনার পেছনে উঠে পড়ে লেগেছে। যেখানে মাল্টিভ্যাকের নিরাপত্তাব্যবস্থা, মানুষ নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার চেয়ে ৩৪৫ গুন বেশি নিরাপদ, সেখানে এরকম একটি ঘটনা সবাইকে চমকে দেবে সেটাই স্বাভাবিক।
মিডিয়ার সবাই মানুষের নিরাপত্তা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে ছেড়ে দেয়া কতটা নিরাপদ তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করছে।

সরকারমহল তাদের উপর মিডিয়ার এই সমালোচনার যত দ্রুত সম্ভব ইতি চায়। এজন্য শাহেদ ও প্রত্যয় কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে,  আসামী কে খুজে বের করে, জিজ্ঞাসাবাদ করে কিভাবে সে পালালো, তা জানার চেষ্টা করার জন্য। এতে যে প্রাইম-৭ এর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি নেই তা প্রমানের করাটাই এখন মূখ্য বিষয়।
গোপন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশের এই দুর্গম দিকে এসে খোঁজ চালাচ্ছে দুইজন কর্মকর্তা। ট্র্যাকার নিয়ে দক্ষিণে যেতে যেতে শাহেদ দেখতে পায় আসামীর অবস্থান প্রায় ২২৩ মিটার দুরে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু ২২৩ মিটার যাওয়ার পরও তারা একটি বড় পাথরের টিলা ছাড়া কিছুই দেখতে পায় না।
প্রত্যয় অভিযোগ করতে লাগলো যে, এখানে না এসে কয়েকটা অভজারভেটরি রোবট পাঠিয়ে দিলেই হতো। শাহেদ, প্রত্যয়ের বিরক্তিভাব বুঝতে পারে, বলাই বাহুল্য সে নিজেও কিছুটা বিরক্ত। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে তাদের এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।তাই কোনো হেলাফেলাও করা যায়না। তারা সেই পাথরের টিলার আশে পাশে সূত্র খুঁজতে লাগলো।

হঠাৎ টিলাটির পাদদেশে একটি জায়গায় কিছু ফাটল দেখতে পায় শাহেদ। পাথরের গায়ে কিছু বিশেষ লতাপাতা দেখে সে। তার মনে কৌতুহল হয়। এধরণের পাথরের গায়ে লতাপাতা জন্মায় না। সে কাছে গিয়ে লতাপাতা সরাতে গেলেই পাদদেশের ফাটলটি প্রায় একটি দরজার মতো খুলে গেলো। তারা দুইজনই উত্তেজনায় অবাক হয়ে যায়!
রোবট দুটিকে ভেতরে প্রবেশের আদেশ দিয়ে নিজেরাও প্রবেশ করে সাবধানতার সাথে। ভেতরে প্রবেশ করেই তারা দেখতে পায় একটি সরু পথ সোজা নিচে চলে গেছে।
পথ অতিক্রম কর নিচে আসার পর তারা একটি বড় রুম আবিষ্কার করে। শাহেদ আশ্চর্য হয়ে দেখে রুমটির মধ্যে এখানে ওখানে অনেক যন্ত্রপাতি যা দেখতে অনেকটা বড় পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রজন্মের কম্পিউটারগুলোর মতো।


আচমকা রুমের বিপরীত দিক থেকে তাদের উপর গুলি করতে থাকে কেউ। শাহেদ ও প্রত্যয় কিছু বোঝার আগেই একটি বুলেট প্রত্যয়ের পায়ে বিধে যায়। শাহেদ খুব দ্রুত একটি কম্পিউটারের আড়ালে কভার নেয়।
অপর পাশে সেই পালিয়ে যাওয়া আসামী এবং তার সাথে ৩ টি ভার্শন-১ রোবটকে দেখা যাচ্ছে। এরাই তাদের দুইজনের দিকে গুলি ছুড়ছে।

শাহেদও পাল্টা গুলি ছুড়তে থাকে এবং ভার্শন-২ রোবটগুলোও পাল্টা আক্রমণ করে আসামী এবং তার সাথের রোবটগুলোকে। কিছুটা সময় পর গুলি থামে, শাহেদ বুঝতে পারে ভার্শন -১ রোবট তিনটি, প্লাজমা ক্যাননের আঘাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।
খুনের আসামী লোকটির মাটিতে পড়ে আছে। গলার পাশ দিয়ে ছুয়ে গেছে একটি বুলেট। এতে সে মারা না গেলেও অনেক জখম হয়েছে। শাহেদ এরপর দ্রুত প্রত্যয়ের কাছে গিয়ে ভার্শন-২ রোবট গুলোকে তার নিরাপত্তা নিশ্চিতের আদেশ দেয়। আর সে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসামীর দিকে এগিয়ে যায়।

কাছে গিয়েই আসামীকে দেখে ভয়ঙ্কর অবাক হয় শাহেদ। অপর দিকের মানুষটিকে চিনতে তার একটুও ভুল হয় না। এ যে সজীব!  সজীব, শাহেদের সাথে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলো। তার থেকে এক বছরের জুনিয়র ছিল সজীব। খুবই মেধাবী আর ভালো মনের মানুষ হওয়ায় শাহেদ তাকে খুবই পছন্দ করতো।
পড়াশোনা শেষ হয়ে যাবার পর আর যেগাযোগ হয় নি তাদের। সজীবের মত একটি ছেলে যে মানুষ খুন করতে পারে তা তার বিশ্বাস হয় না। প্রাইম-৭ এর অপরাধী ধরায় কোনো ভুল হলো নাতো?
এভাবনা শাহেদের মধ্যে আসলেও তা সে নাকচ করে দেয়। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাকে বলে যে, প্রাইম-৭ কোনো ভুল করেনা।
সজীবের কাছে গিয়ে তাকে ধরে একটি চেয়ারে বসায় শাহেদ। সজীবও শাহেদকে চিনতে পেরেছে।
শাহেদ তাকে সবকিছুই জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করে। কি কারণে সে হত্যা করেছিলো, কিভাবেই বা প্রাইম-৭ কে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে আসল সে!

একথা শুনতেই সজীব কিছুটা হাসার চেষ্টা করল। জবাবে বললো, সে নাকি কখনো প্রাইম-৭ কে ফাঁকিই দেয় নি। বরং প্রাইম-৭ ই তাকে পালাতে পথ করে দিয়েছে। শাহেদ তার কথায় প্রচন্ড অবাক হয়।
প্রাইম-৭, যার উপর সবার নিরাপত্তার ভার সে এরকম কেন করবে? এই প্রশ্নটি তার মাথা ভার করে দেয়। সে সজীবকে মুহুর্তের জন্য অবিশ্বাস করে।
সজীব আরো বলতে থাকে যে, সে নাকি কখনো কাউকে হত্যা করেইনি। প্রাইম-৭ তাকে ফাঁসিয়েছে। নিরাপত্তা বিভাগে ভুল তথ্য দিয়েছে, তার ব্যক্তিগত ডেটায় সন্দেহজনক তথ্য যুক্ত করেছে। যেহেতু প্রাইম -৭ সকল ডেটা সেন্টারই এক্সেস করতে পারে। এছাড়া জেলে বন্দী থাকার সময় তার সেল মনিটরে প্রাইম-৭ তাকে কতগুলো তথ্য দিয়েছে দেশের উচ্চপদস্থ সরকারী নেতাদের সম্পর্কে, এর মধ্যে রাষ্ট্রপতিরও কিছু গোপনীয় তথ্য ছিল যা জনসাধারনের সামনে প্রকাশ পেলে দেশে বিক্ষোভ হবে, এমনকি তা গৃহযুদ্ধের পর্যায়েও চলে যেতে পারে।
এসব তথ্য মানুষের মাঝে প্রকাশ করবার জন্যই তাকে জেল থেকে পালাতে দিয়েছে প্রাইম-৭!

সজীবের কথায় শাহেদ বড়সড় একটি ধাক্কা খায়, একটি কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার কম্পিউটার যে দেশে এরকম সহিংসতা ঘটানোর চেষ্টা করবে তা তার বিশ্বাস হয় না। আবার সজীবের কথাকেও মিথ্যে মনে করতে তার মন সায় দেয় না। তাহলে কি প্রাইম-৭ নিজেকে মানুষ থেকেও উন্নত ভাবতে শুরু করেছিলো? তাহলে কি তারমধ্যে কৃত্তিম আবেগ, অহংকার তৈরি হয়েছিল, যার কারনে সে মানুষকে ঘৃনা করতে থাকে, মানুষের অধীনস্থ থেকে কাজ করতে চায় না। বিষয়গুলো এখন খুবই জটিল হয়ে গিয়েছে।

এসব কথা যদি সত্য হয় তাহলে এসব বাইরে প্রকাশ করা যাবে না। পুরো দেশেরে সকল নিরাপত্তার জন্য তা হুমকি হবে। বরং কোনোভাবে যদি সরকারের ৫ মোড়লদের একজনকে জানানো যায়, তাহলে প্রাইম-৭ কে বন্ধ করা যাবে। এসব কথা ভেবে সে সিকিউর লাইনে যোগাযোগের জন্য একটি ষষ্ঠ প্রজন্মের কম্পিউটার ওপেন করে।

অবাক হয়ে সে দেখে এখানের সব কম্পিউটার মাল্টিভ্যাকের নিয়ন্ত্রণে। শাহেদ এখন কি করবে ভেবে পায় না। আতঙ্কের শীতলতায় ঘামতে থাকে সে। প্রাইম-৭ তার ব্যাপারে সব জেনে গেছে। এখন প্রাইম-৭ ইচ্ছা করলে তার ব্যাক্তিগত তথ্য পরিবর্তন করে তাকেও আসামী বানিয়ে দিতে পারে। আর সেটি হলে, সে আর কখনোই কাউকে জানাতে পারবে না কি হয়েছিলো। শাহেদ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকে। হঠাৎ তার দৃষ্টি যায় বড় স্ক্রিনের দিকে, যেখানে একটি লেখা ভাসতে থাকে...

"আমি মানুষকে ঘৃনা করি, তোমাদের ধ্বংস অনিবার্য"  


লেখকঃ আনাস রোহান

ইতিহাসনাম.কম এর তিনজন সহ-প্রতিষ্ঠাতার একজন।বিক্ষিপ্ত মনের অধিকারী।