ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

দর্শনীয়স্থানঃহরমুজ প্রনালী-এক বিচিত্র সৌন্দর্যের সম্মেলন - লিখেছেন - আনাস রোহান


প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর্ষন কোন মানুষই বা উপেক্ষা করতে পারে? আমরা সবাই যে সৌন্দর্যের পূজারি। তাই তো যখনই গতানুগতিক জীবন থেকে খানিকটা অবসর পাই, আমরা ভ্রমন করি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে।

এসবের মধ্যে সবসময়ই প্রথম দিকে থাকে সমুদ্রসৈকত বা কোনো দ্বীপ। সৌন্দর্যের সাথে সাথে অসাধারন বিষয় যা সচরাচর আমরা দেখি না তাও আমাদের টানে। এখন কেউ যদি একই সাথে উভয় আকাঙ্খা পূরন করতে চায়, সে যেতে পারে ইরানের হরমুজ দ্বীপে।

হরমুজ দ্বীপ, ইরানের উপকূল থেকে ৮ কিঃমিঃ দুরে অবস্থিত। ৪২ বর্গ কিঃমিঃ আয়তনের এর এই দ্বীপটি হরমুজ প্রনালী নামে পরিচিত।এটির পূর্বে ভারত, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর এবং উত্তরে পারস্য উপসাগর অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এটির সর্বোচ্চ স্থানের উচ্চতা ১৮৬ মিটার। এটি পাথর এবং অগ্ন্যুতপাত হতে আসা বিভিন্ন পদার্থ দ্বারা আবৃত। অধঃক্ষেপণের পরিমান কম হওয়ার কারনে হরমুজ দ্বীপের পানি ও মাটি লবনাক্ত। যেহেতু হরমুজ দ্বীপে কোনো মিঠা পানির উৎস নেই, তাই ইরানের মূলভূখন্ড থেকে পাইপের দ্বারা পানি আনা হয় এখানে।


ইরানের বন্দর, আব্বাস শহর থেকে ফেরিতে করে যাওয়া যায় হরমুজ দ্বীপে। হরমুজ প্রনালীর মধ্যে একটি গ্রামও আছে যেখানে প্রায় ৭০০০ এর মত মানুষ বসবাস করে থাকে। সেসব মানুষ তাদের যাতাযাতের ব্যবস্থার জন্য স্পিডবোট ব্যবহার করে থাকে। তবে গ্রামের অভ্যন্তরে যাতায়াতের জন্য খুবই কম সংখ্যক গাড়ি রয়েছে। দ্বীপের যেকোনো স্থানেই ক্যম্পিং করার অনুমতি আছে পর্যটকদের।

থাকার জন্য কয়েকটি ছোটো ছোটো হোটেলও রয়েছে এখানে। প্রতিবছর অনেক ভ্রমনপ্রেমী মানুষ হরমুজ প্রনালীতে ভ্রমন করে তার অপরুপ সুন্দর স্থানগুলো দেখার জন্য।







ব্লাড বিচঃ

হরমুজ প্রনালীতে অনেক দর্শনীয় জায়গা রয়েছে। এদের মধ্যে কতগুলো আবার অসাধারণ। তাদের মধ্যে প্রথমেই আসে ব্লাড বিচ (রক্তাক্ত সৈকত)।
হরমুজ প্রনালীর দক্ষিনে এটি অবস্থিত। এটির অন্য নাম হল লাল সৈকত। সাধারনত আমাদের সচরাচর অভিজ্ঞতায় আমরা দেখি সমুদ্র সৈকত গুলো সাদা বালিতে পূর্ন থাকে। কিন্তু ব্লাড বিচের মাটিগুলো লাল, এবং এ লাল মাটি সমুদ্রের পানিতে মিশে তাকেও লাল করে তুলেছে। দেখলে মনে হয় যেন রক্তে পরিপূর্ন হয়ে আছে সৈকত এবং তার আশেপাশের পানিগুলো।

ব্লাড বিচের মাটির মধ্যে প্রায় ৭০% আয়রন অক্সাইড (Fe2O3)থাকায় এটির রং লাল হয়েছে। এই আয়রন অক্সাইড শিল্প ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এখানে প্রায় ৫০০০০ টনের মত লাল মাটির মজুদ রয়েছে, যা থেকে লোহা পৃথক করা সম্ভব। আয়রন অক্সাইড সিরামিক, ডায়িং শিল্পে ব্যবহার করা হয়। এটি বিভিন্ন বিক্রিয়ার প্রভাবক হিসেবেও কাজ করে। ব্লাড বিচের প্রাকৃতিক লাল মাটি দেশীয় মশলা হিসেবেও দ্বীপে বসবাসকারী মানুষ ব্যবহার করে। 


পর্তুগীজ দূর্গঃ


হরমুজ দ্বীপের উপকূল হতে ৭৫০ ভিতরে এই দূর্গ অবস্থিত। এই দূর্গটিকে পারস্যেদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দূর্গ হিসেবেও ধরা হয়। ১৫০৭ সালের দিকে পর্তুগীজ শাসনামলে নৌবাহিনীর এডমিরাল "আলফনসো দা গ্রেট" এশিয়া মহাদেশে তার প্রভাব বাড়ানোর জন্য হরমুজ দ্বীপ দখল করেন।
<ইমেজ দিস ওর>
তখন তিনি এই দূর্গের স্থাপন করেন। প্রায় ১৫১৫ সালের দিকে এর স্থাপনা শেষ হয়। এ দূর্গের ছাদগুলো প্রবাল পাথর দিয়ে সাজানো হয়েছে। দূর্গটির কারুকার্য পর্তুগীজ স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন বহন করে। যদিও বর্তমানে সরকারি অবজ্ঞার কারনে এর দেয়ালের অনেক অংশ খসে পড়েছে এবং ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এই মৌলিক স্থাপত্যের অনেক চিহ্ন। তারপরও পর্যটকদের কাছে এটি একটি উল্লেখযোগ্য স্থান।

স্প্যানিশ বিচঃ

হরমুজ প্রনালীর মধ্যে হয়েও এর নাম স্প্যানিশ বিচ দেয়ার কারন হিসেবে বাসিন্দারা একজন পর্যটকের কথা জানান যিনি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে এসে মন্তব্য করেন যে, হরমুজ প্রনালীর এই দ্বীপটির মত দ্বীপ শুধুমাত্র স্পেনেই দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের থেকেও সুন্দর।স্প্যানিশ বিচের উঁচু, কঠিন উপত্যকাগুলো যেকোনে পর্যটককেই আবিভূত করবে। শুধুমাত্র বলার মাধ্যমে এর সৌন্দর্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

লবনের গুহাঃ

হরমুজের উত্তর দিকে অবস্থিত এ গুহা। এটিতে প্রবেশের জন্য আগে কয়েকটি বড় বড় পাহাড় অতিক্রম করতে হয়। এ লবন গুহা হরমুজের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের একটি অন্যতম নিদর্শন। গুহার ভিতরের দেয়ালে বিভিন্ন আকৃতির লবনের মোম দেখা যায়। যা অতিরিক্ত সৌন্দর্য যোগ করে এর সাথে। গুহাটির মধ্যে প্রবেশ করে আপনাকে অবশ্যই লবনাক্ত পানিতে ভিজতে হবে। কোনো কারনবশত গুহাটির মধ্য দিয়ে এখনো লবনাক্ত পানির প্রবাহ বিদ্যমান। মনে করা হয় দ্বীপের বায়ুর আদ্রতা এবং গুহার মধ্যে পানির প্রবাহের ফলে সম্পৃক্ত লবনের নিমজ্জন ঘটে এবং পানি লবনাক্ত হয়।

তুষারস্নাত পাহাড়ঃ

হঠাৎ করে শুনলে মনে হতে পারে যেখানে ইরান একটি দীর্ঘ গরমকালের দেশ, সেখানে  হরমুজ দ্বীপে তুষারপাত হয় কি করে, আসলে দ্বীপটির অন্যান্য পাহাড় যেখানে বিভিন্ন বর্নের মাটি দ্বারা আবৃত থাকে সেখানে এই পাহাড়টি লবন দিয়ে গঠিত। লবনের পাথর ও কেলাসের আকারের কারনে এটিকে দুর থেকে দেখলে মনে হয় তুষার দ্বারা আবৃত আছে। এবং, এই জন্যই একে তুষারস্নাত পাহাড় বলে।


মাটির মাদুরঃ

২০০৮ সাল থেকে বছরের দ্বিতীয় অর্ধেক সময় যখন হরমুজ দ্বীপের দক্ষিন অংশে পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায় তখন দ্বীপ হতে প্রাপ্ত বর্নিল মাটি দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। এটিকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মাটির মাদুর হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়।

সত্যিকারেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ঐকতান কবিতায় ঠিকই বলেছেন, বিশাল এই পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি, কত দেশে কত সুন্দর সুন্দর নিদর্শন রয়ে গেছে আমাদের অগোচরে। তারপরও ভ্রমনবৃত্বান্ত পড়ে ওই আক্ষেপের কিছুটা হলেও পূরন সম্ভব।  



Source:https://www.saadatrent.com/english/article/everybody-should-visit-this-island-before-they-die


https://adventuresoflilnicki.com/hormuz-island-guide-iran/

লেখকঃ আনাস রোহান

ইতিহাসনাম.কম এর তিনজন সহ-প্রতিষ্ঠাতার একজন।বিক্ষিপ্ত মনের অধিকারী।