ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

বাবা তোমায় ভালোবাসি - লিখেছেন - কে এম সিয়াম




আবীর টঙ এ বসেছে। দুধ চা নিয়েছে। সাথে একটা সিগারেট। সিগারেটের অভ্যাসটা হয়েছে কলেজে উঠে। দু'বছর হলো। ছাড়ার চেষ্টা করছে। পারছে না। তার বাবাও নিষেধ করেছে। কিন্তু সে শুনে নি।
মানুষের সাইকোলজি খুব জটিল। যে বাবার এই সামান্য কথা সে শুনছে না, সেই বাবাকে সে প্রচণ্ড ভালোবাসে। বাবাকে নিয়ে কেউ কিছু বললে ছাড় দেয় না সে।
হঠাৎ ঝুমঝুম আওয়াজ শুরু হলো। বৃষ্টি পড়ছে। মেঘ ডাকছে। আবীরের হাতে দুধ চা আর সিগারেট। অদ্ভুদ সুন্দর এক পরিবেশ!
আবীর ভাবতে লাগল-মানুষের জীবনে কোন বস্তু সবচেয়ে বেশি রূপ বদলায়? পরিবেশ! পরিবেশ রূপ বদলায় চোখের পলকের ব্যবধানে। আবীর যখন টঙ্গে আসল কাঠফাটা রোদ মাথার উপর খট্মট করছিল। আর এখন তা ঘন অন্ধকারে রূপ নিয়েছে। বিজলির আলোয় এক আধবার সব ফর্সা হয়ে পরক্ষণেই নিকষ কালো।
আবীরের ফোন বাজছে। তার বন্ধু ফোন দিচ্ছে। এই অদ্ভুদ রোমান্টিক পরিবেশে তার ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না। তাও সে ধরলো।
ফোনটা ধরে লাভই হলো। একটা সুসংবাদ পেল। সে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে। পজিশন ২০। তার স্বপ্নের 'জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং' হয়ত পেয়ে যাবে।
বাসার সবাইকে জানাতে হবে। নীলিমাকেও জানাতে হবে। নীলিমা তার বান্ধবী। কাকে আগে ফোন দিবে-ভাবতে লাগল আবীর!!

কয়েক মাস আগের কথাঃ
(সকাল ৭ঃ০১ মিনিট)

"আরে চা-টা খেয়ে নে। দু'টা বিস্কুট নে।" 


"উহু! দেরি হয়ে যাচ্ছে বাবা।"
"পকেট্মানি আছে?" 

"হুম। ১২৫ টাকা।" 

"এই নে ২০০ টাকা। আনে-দানে খরচ করবি না।" 

"আচ্ছা।" 
(বাবা তাকে প্রচন্ড বিশ্বাস করে। আবীরও বিশ্বাসের মর্যাদা রাখে। শুধু সিগারেটের সাথে কম্প্রমাইজ করতে পারে না।) 

"মোবাইলে টাকা আছে না? না থাকলে বলিস।"
"আচ্ছা।" 

আবীর বাসা থেকে দৌড়িয়ে বের হল। কলেজের বাস ধরতেই হবে।
বাসটা ধরতে পেরেছে সে। সকাল বেলার প্রথম দৌরে সে সফল হল। বাসে উঠতে গিয়ে দেখে বাবা পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন। হাপাচ্ছেন। আবীর আশ্চর্য হয় নি। এটা তার কাছে নিত্যদিনকার দৃশ্য। বাবা তাকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দেয়।
পৃথিবীতে এই মানুষটা বাদে আর কেউ আবীরের জন্য এতটা ভাবে কিনা-তার নেই। বোধ হয়- না!!

পানির অপর নাম জীবন। বাবার অপর নাম ত্যাগ। এই মানুষটা যেন ত্যাগ করতেই ভালোবাসে। ঈদের আনন্দও সে উপভোগ করে ত্যাগের মাধ্যমে।
গত ঈদের ঘটনা-
"তোকে একটা পাঞ্জাবি কিনে দিব। জুতাও লাগবে একজোড়া।"
একটু থেমে-"তোর মাকে একটা শাড়ী কিনে দেব। বেচারী অনেক কষ্ট করে!"
মধ্যবিত্ত পরিবারের সম্পর্কগুলো খুব মজবুত হয়। প্রতিটি সম্পর্কই একেকটা ভিত্তি। সবগুলো ভিত্তি যখন জোরালো হয় তখনই একটা দালান আকাশ্চুম্বি হয়। আবীর মধ্যবিত্ত পরিবারের ই ছেলে। সে এই বিষয়গুলো ফিল করে।
আবীর বলল-"বাবা, তুমি এবার একটা শার্ট নিবে। এক বছর ধরে এই শার্ট পড়ছ। জুতোয় ছিড়ে গেছে তোমার।"
"দূর বোকা! শার্ট তো এখনো নতুন। জুতা সেলাই করেছি। রঙ করলেই নতুন হয়ে যাবে।"
আবীর জানে, তার বাবাকে সে শত বললেও সে নতুন জামা কিনবে না।

আবীর লক্ষ্য করল- সে তার বাবাকে কখনো কাঁদতে দেখে নি। সে মায়ের কান্নাকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। মা তো পড়ে গেলেও কাঁদে। বাবা সেখানে সাহস দেয়। বাধা অতিক্রমের শিক্ষা দেয়। বাবার এক ফোঁটা চোখের জল অনেক ইতিহাসের কথা স্মরণ করায়।
পৃথিবীর সব বাবাই গাছের মত। সন্তানের গায়ে রোদের তিক্ততা লাগতে দেয় না। সন্তানকে ছায়া দিয়ে আগলে রাখে।

আবীর আজ প্রথম ফোনকলটা বাবাকেই করবে। সে জানে তার বাবা আজকে কাঁদবে। কয়েক ফোঁটা অশ্রু তার গাল বেয়ে নেমে দাঁড়ি ভিজিয়ে দেবে। তবে এ কান্না বেদনার নয়; এ কান্না আনন্দের গর্বের শত প্রতীক্ষার!!!

বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশের কালো মেঘ সরে যাচ্ছে। নীল মেঘ সে জায়গা দখল করে নিচ্ছে। দুপুরের বৃষ্টিতে রঙধনুর আবির্ভাব ঘটে। আজ তা দেখা গেল না। তাতে কি! তার মনেই আজ রংধনু খেলে করছে। আজ সে উৎফুল্ল উচ্ছসিত। নিজেকে সফল মনে হচ্ছে তার। মনের অজান্তেই মুচকি(অস্ফুট) এক হাসি দিয়ে বলে উঠলো-"বাবা, আমি তোমায় অনেক ভালবাসি।"

+লেখক: কে এম সিয়াম


সামাজিক হয়ে উঠার প্রধান শর্ত বিশ্বাস করতে পারা। লেখক বিশ্বাস করেন প্রগতিশীল বিশ্বাস দিয়ে পৃথিবী জয় করা সম্ভব।
লেখকের ফেসবুক:আইডি লিংক