ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

নিকোলা টেসলা: গড অফ অল সাইনটিস্ট - লিখেছেন - জুনায়েদ ইসলাম



"Let the future tell the truth, and evaluate each one according to his work and accomplishments. The present is theirs; the future, for which I have really worked, is mine."




নিকোলা টেসলাকে নিয়ে বলা শুরু করলে শেষ কখন করতে পারব তা আমার জানা নেই। এখন পর্যন্ত যত বিজ্ঞানী এসেছেন ,এদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় বিজ্ঞানী এই টেসলা। তার কারণ ও রয়েছে। কারণটি হলো তাঁর জীবনী। আপনিও যদি তাঁর জীবনী পড়ে থাকেন তাহলে আপনার কাছেও নিঃসন্দেহে সে একজন প্রিয় বিজ্ঞানী হয়ে উঠবে। একটা বিষয়ে আগে থেকেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি বিভিন্ন রিসোর্স ঘেটে আর্টিকেলটা করতে হয়েছে এজন্য বড় হয়ে গেছে। আমার উচিত ছিল দুইটি পর্বে ভাগ করে লিখার। কিন্তু আমি একটি পর্বেই সবকিছু বলার চেষ্টা করেছি কারণ মানুষের আগ্রহ যেকোনো জিনিসে প্রথম প্রথম বেশিই থাকে। তবে আপনাদের জন্য আর্টিকেলের শেষের দিকে চমক অপেক্ষা রয়েছে যখন জানতে পারবেন এই বিজ্ঞানীর সাথে বর্তমানে কার যোগসূত্র রয়েছে...   







"পরিষ্কারভাবে চিন্তা করার চেয়ে আজকের বিজ্ঞানীরা বরং গভীরভাবে চিন্তা করতে পারছে।পরিষ্কারভাবে চিন্তা করবার জন্য আপনাকে অবশ্যই মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করবার জন্য চাই একটি তার চাইতেও প্রখর মগজ।"  

একবার আইনস্টাইন কে প্রশ্ন করা হয়েছিল,‘পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি হতে কেমন লাগে?’
উনি উত্তর দিয়েছিলেন,‘এর উত্তর আমার জানা নেই। আপনি নিকোলা টেসলাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন!’



তারিখটা ছিল জুলাই ১০। ১৮৫৬ সাল। সেদিনের মধ্যরাতের কাহিনী ছিল এক বিস্ময়। ক্রোয়েশিয়ারই (পূর্ব নাম সিমিলজান) কোন এক প্রান্তিক গ্রাম স্মিয়ানের এক ছোট্ট বাড়িতে প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছিল ডিউকা টেসলা। চিন্তিতভাবে পায়চারি করছিল তার খ্রিস্টান স্বামী মিলুতিন টেসলা (যিনি ছিলেন চার্চের একজন ধর্মযাজক এবং লেখকও)। ওদিকে বাইরে তখন চলছে তুমুল ঝড়। থেকে থেকে বজ্রপাতের শব্দ আর মুষলধারে বৃষ্টি। প্রসব কাজ সবে শেষ হয়েছে।  
বৃদ্ধা ধাত্রী বজ্রপাতের ঝলকানি দেখে ভয় পেয়ে গেল এবং শিশুটির জন্ম (child of darkness), সে একে অশুভ সংকেত হিসেবে ধরে নিল।
কিন্তু তা মানতে রাজি নন ডিউকা। বরং তিনি বাচ্চাকে আশীর্বাদ করলেন এবং বললেন,“আমার এ সন্তান ছড়িয়ে দেবে আলো!”  







সেই সন্তান(child of light) কিন্তু পরবর্তীতে আলোই ছড়িয়ে দিয়েছিল। টেসলার মা ডিউকা কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি। তবে টেসলা মনে করতেন তিনি তার অসাধারণ স্মৃতিশক্তি তার মায়ের কাছ থেকে বংশগতভাবে ও তার মায়ের পরিচর্যা ও প্রভাবে পেয়েছেন। টেসলার পূর্বপুরুষরা ছিলেন পশ্চিম সাইবেরিয়ান, মন্তিনিগ্র এলাকার। টেসলা তার বাবা মায়ের পাঁচ সন্তানের মধ্যে ৪র্থ ছিলেন। তার তিন বোন মিল্কা, আঞ্জেলিনা, মারিকা আর এক ভাই  যিনি এক ঘোড়া দৌড় প্রতিযোগিতায় মারা যায় যখন টেসলার বয়স ৫ বছর।
টেসলা ১৮৬১ সালে সিমিলজানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান, যেখানে তিনি জার্মান, গণিত আর ধর্ম শেখেন। ১৮৬২ সালে তার পরিবার গোসপিক এ যায়, যেখানে তার বাবা ধর্মযাজক হিসেবে কাজ করত। টেসলা তার প্রাথমিক শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা শেষ করেন। ১৮৭০ সালে তিনি উত্তরের কারলোভাকে যান উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে। সেখানে জার্মান ভাষায় শিক্ষা দেয়া হতো।

খুব ছোট বয়সে একটি ঘটনা টেসলার মন তোলপাড় করে দেয়।
এক বর্ষণমুখর রাতে নিকোলার বাবা পাদ্রি মিলুতিনের ডাক আসে  যজমানের ঘর থেকে। ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথে যখন মিলুতিন যজমানের বাড়ি যাচ্ছেন, তখন জঙ্গলে নেকড়ের পাল মিলুতিনের ঘোড়াকে আক্রমণ করে। ক্ষতবিক্ষত ঘোড়া মিলুটিনকে জঙ্গলে ফেলে রেখে বাড়ি ফিরে আসে। পরিবারের মানুষ আহত ঘোড়ার পিঠে মিলুটিনকে দেখতে না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরিবারের শোক ঘোড়াটিকে এতটাই বিচলিত করে তুলেছিল যে, সে আবার উদ্যম জুটিয়ে দুর্ঘটনার জায়গায় ফিরে গিয়ে তার প্রভুকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। সে যাত্রায় বেঁচে যান পাদ্রী সাহেব।

এই ঘটনা নিজের লেখা বই,‘মাই ইনভেনশনস’এ উল্লেখ করে নিকোলা মন্তব্য করেন, ঘোড়াটার কাছে তিনি শিখেছিলেন,একবার হেরে গিয়ে কোমর শক্ত করে আবার কীভাবে জিতে যেতে হয়। সারাজীবন সেই যোদ্ধা ঘোড়াটাই যেন বিজ্ঞানের দুস্তর ভূমিতে নিকোলাকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। তাই সারাজীবন ধরেই জ্ঞানপিপাসু এই মানুষটি নজির সৃষ্টিকারী কর্মদক্ষতা দেখিয়ে বিস্মিত করেছেন মানবসমাজকে। টেসলা ছোটবেলা থেকেই তাঁর প্রতিভার সাক্ষর রাখা শুরু করে ও মানুষজনকে তাঁর প্রতিভার মাধ্যমে অবাক করে দিত। তাঁর কিছু উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন আরো সহজেই।

ছোট থেকেই তাঁর ছিল ফটোগ্রাফিক মেমরী আর অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা। তাঁর উপস্থিত বুদ্ধির একটি উদাহরণ দেই।
১৮৬২ সালের একটা ঘটনা। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির অধীনস্থ শহর গস্পিক শহরের রবিবারের এক মনোরম সকাল। এক যুবা ব্যবসায়ীর সেই শহরে আগুন নেভানোর এক সংস্থা ছিল। আগুন নেভানোর জন্য অত্যাধুনিক এক মেশিন কেনা হবে। মেশিন বিক্রি করবে যে কোম্পানি, তার লোকজন সকাল থেকে বেজায় শোরগোল ফেলে দিয়েছে নদীর পাড়ে। কীভাবে নতুন মেশিন কাজ করে, তা হাতেনাতে পরীক্ষা করে দেখাতে হবে। শহরের গণ্যমান্যদের নেমন্তন্ন করা হয়েছে। তামাশা দেখবে বলে নদীর পারে দলে দলে সাধারণ মানুষ নতুন পোশাক পরে হাজির। নদী থেকে পাম্প করে জল তুলে দেখিয়ে দেবে কোম্পানির নতুন মেশিন। সেই মেশিন চালাতে আবার ১৬ জন লোক লাগে।

মেশিন কোম্পানির এক কর্তা ব্যক্তি মেশিনের উপযোগিতা নিয়ে আবেগ মেশানো গলায় বক্তৃতা দিলেন। মেশিন চালু করবার হুকুম দেওয়া হল। সবাই উৎকণ্ঠিত। মেশিন চালু হল, কিন্তু একবিন্দু জলও তার মুখ দিয়ে বেরোল না। পাম্প বন্ধ করে আবার চালু করা হল। ফলাফলের হেরফের হল না। কোম্পানির কর্তাদের মাথায় হাত। উপস্থিত জনতা বিদ্রুপ করছে। কর্তাদের কপালে শীতের সকালেও ঘাম জমে উঠল। গণ্যমান্যরা তো বিরক্ত। হাতির চাইতে আকারে বড়, বাজে একটা মেশিন, এভাবে তাদের ছুটির দিনের সকাল বরবাদ করার কোনও মানে হয়?  

হঠাৎ দেখা গেল, ছ-সাত বছরের একটা দামাল ছেলে কোথা থেকে ছুটে এসে নদীতে ঝাঁপ দিল। নদীর জলে ডুব দিয়ে ছেলেটি যেই না জল পাম্প করবার মেশিনের সাকশান পাইপ সোজা করে দিয়েছে, অমনি মেশিনের মুখ দিয়ে বেজায় তোড়ে জল বেরিয়ে এল। পাইপের মুখ দিয়ে তীব্র বেগে বেরিয়ে আসা জলে উপস্থিত ভদ্রজনদের পোশাক ভিজে যেতে তারা ভীষণ রেগে গেলো। সবাই হইহই করে উঠল। কম্পানির কর্তারা কিন্তু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। আসলে হাওয়ার চাপে সাকশান পাইপ চুপসে যাওয়ার ফলে পাইপে জল ঢোকার রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটি জলে ডুব দিয়ে পাইপ সোজা করে দিতেই মেশিন চালু। কোনো বিজ্ঞান পাঠ না করে, শুধু উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করে, এই সহজ "হাওয়ার চাপের নীতি" সেদিন যে বালকের মাথায় এসেছিল, তিনি আর কেউ নন, পরবর্তীকালের এসি মোটরের জনক, প্রকৌশলী-বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা!    







তিনি তাঁর যেকোনো বই একবার পড়ে অনায়াসে মুখস্থ করে ফেলতে পারতেন। আর ম্যাথের জটিল সব ক্যাল্কুলাস তিনি শুধু মাথার মধ্যেই ক্যালকুলেশন করে বলে দিতে পারতেন। ভালো কথা ক্যাল্কুলাস নিয়ে তাঁর লাইফের একটা ঘটনা বলি।
১৮৭০ সালের ঘটনা।
ক্রোয়েশিয়ার এক স্কুলে ম্যাথ ক্লাস চলছে। আজকের টপিক ইন্টিগ্রেশন। বেশ কটা ক্লাসের পর আজকে কঠিন কঠিন ইন্টিগ্রেশন শুরু করবেন স্যার। বোর্ডে কতগুলো অঙ্ক লিখে টিচার ফিরলেন সবাই অঙ্ক করছে কিনা দেখতে। সবাই মনোযোগ দিয়ে করছে। কিন্তু একজন বসেই আছে। স্যার তার দিকে এগিয়ে গেলেন।
“তুমি কেন করছ না?”
১৪ বছরের সেই ছেলেটা বোর্ডের সবগুলো অংকের উত্তর বলে গেল।
স্যার ভাবলেন ছেলেটা উত্তর হয়ত মুখস্ত করে এসেছে। তিনি বানিয়ে কয়েকটা দিলেন। ছেলেটা এবারও সবগুলোর নির্ভুল উত্তর বলে দিল! একবারও খাতা কলম হাতে নিল না।
টিচার বুঝতে পারলেন, এই ছেলে ভয়ঙ্কর মেধাবী। এমনকি পরীক্ষায়ও সে অনায়াসে সব করে ফেলতে পারত বলে তাঁর উপর টিচাররা সন্দেহ ও করত।
এভাবে ১৮৭৩ সালেই তিনি তার ৪ বছরের বিদ্যালয় মাত্র ৩ বছরে শেষ করেন। ১৮৭৪ সালে তিনি অস্ট্রিয়-হাঙ্গেরির সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি শিকারি পর্বত অন্বেষণ করেন। তিনি বলতেন, প্রকৃতি তাকে মানসিক এবং শারীরিকভাবে শক্তিশালী করেছে
তিনি টোমিনগাজ এ থাকাকালীন অনেক বই পড়েন। পরে তিনি বলেন যে, মার্ক টোয়েন এরসাথে কাজ করায় তার প্রাথমিক অসুস্থতা দূর হয়েছিলো। ১৮৭৫ সালে নিকোলা টেসলা অস্ট্রিয়ার গারাজে সেনাবাহিনীর একটি বৃত্তি লাভ করেন। তিনি প্রথম বছর কোন ক্লাস বাদ দেননি এবং সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ৯ টি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি সাইবেরিয়ান একটি সংস্কৃতি ক্লাব এ যোগদান করেন। তার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধানের কাছ হতে তার বাবার কাছে একটি চিঠি যায়।

সেখানে লিখা ছিল, আপনার ছেলে মেধাতালিকায় প্রথম। টেসলা বলেন যে, তিনি রবিবার এবং ছুটির দিন ছাড়া অন্য সব দিন ভোর ৩ টা হতে রাত ১১ টা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তিনি তার বাবার কাছ থেকে কঠোর পরিশ্রম করার অনুপ্রেরণা পেতেন। ১৮৭৯ সালে তার বাবার মৃত্যুর পর তার প্রফেসর এর কাছ থেকে তার বাবার চিঠি পান। সেখানে লিখা ছিল অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে টেসলা মারা যেতে পারে। যদি টেসলা অতিরিক্ত পরিশ্রম করে তবে তাকে যেন বিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়া হয়।
সেই সময় ২য় বর্ষে থাকাকালীন তিনি তার শিক্ষক গ্রামে ডাইনামো দ্বারা প্রভাবিত হন। তবে তিনি ২য় বর্ষের পর তার বৃত্তি হারান কারণ তিনি জুয়া খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েন। ৩য় বর্ষে তিনি ভর্তি সুবিধাসহ সকল সুবিধা হারান। এরপর তিনি সব ছেড়ে তার পরিবার এর কাছে ফিরে যান। তিনি বলেছিলেন, তার আবেগ আগে ও পরে সব সমান ছিল। পরবর্তীতে তিনি আমারিকাতে বিলিয়ার্ড খেলায় বেশ সুনাম অর্জন করেন।
যখন পরীক্ষা চলে আসে তখন তিনি পরীক্ষার জন্য তৈরি ছিলেন না। তিনি পড়ালেখা করতে অস্বীকার করেন। তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ বর্ষে কোন নম্বর পাননি। ১৮৭৮ সালে তিনি তার পরিবারের সাথে সব কিছু গোপন রেখে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেন। এরপর তিনি মারিবর চলে যান। যেখানে তিনি মাসে মাত্র ৬০ ফ্লরিন এর জন্য কাজ করতে থাকেন। তিনি তার সময় রাস্তার মানুষের সাথে কার্ড খেলে পার করতেন। ১৮৭৯ সালে তার বাবা মিলুতিন মারিবর যান তাকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

১৮৭৯ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি গোসপিক ফিরে আসেন। ১৮৭৯ সালের ১৭ এপ্রিল তার বাবা মারা যান। তখন তিনি গোসপিক বিশ্ববিদ্যালয় এর সবচাইতে বয়স্ক ছাত্র। ১৮৮০ সালে তিনি তার দুই চাচার কাছ থেকে টাকা নিয়ে গোসপিক ত্যাগ করে প্রাগে আসেন পড়ালেখা করার জন্য কিন্তু তিনি অনেক দেরি করে ফেলেন। তিনি কখনও গ্রিক ভাষা শিখেননি এবং চেক ভাষাও জানতেন না। তাই এসব বিষয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় হতে কোন নম্বর পান নি। ১৮৮১ সালে টেসলা, বুদাপেস্ট এর একটি কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন।তিনি বুঝতে পারেন যে তার এই কোম্পানি নির্মাণাধীন, তাই তিনি কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তার কোম্পানি বুদাপেস্ট এর অন্যতম কোম্পানিতে পরিণত হন এবং তিনি ছিলেন তার প্রধান ইলেক্ট্রিশিয়ান। তিনি সেখানে চাকরি করার সময় কোম্পানির যে উন্নতি হয় তা পরবর্তীতে আর কেউ করতে পারে নি।    








নিকোলা টেসলার সমৃদ্ধ কর্মজীবনের শুরুটা হয়েছিল ১৮৮৪ সালের জুনে। খুব কষ্টে পয়সা জমিয়ে চেপে বসা জাহাজটা যখন ভিড়লো আমেরিকায়, টেসলার সম্বল ছিল কিছু পুরনো জামা আর পকেটের চার সেন্ট আর একটা সুপারিশপত্র। সুপারিশপত্রটি লিখেছিলেন এডিসনের প্রাক্তন নিয়োগকর্তা চার্লস ব্যাচেলর।
এতে লিখা ছিলো, "প্রিয় এডিসন, আমি দুজন মহান ব্যাক্তিকে চিনি। একজন আপনি, আরেকজন এই তরুণ "।

জীবিকার খোঁজে আমেরিকায় এসে চাকরি পেয়ে যান বিখ্যাত বিজ্ঞানী থমাস আলভা এডিসনের কাছে। ২৮ বছরের তাগড়া জোয়ান টেসলা যখন আমেরিকায় পা রাখলেন, সেখানে তখন চলছিল শিল্পসমৃদ্ধির স্বর্ণযুগ। কিন্তু, সমস্যাটা বাধত সূর্য ডোবার সাথে সাথেই। থেমে যেত সমৃদ্ধির এ চাকা। অন্ধকারে ডুবে যেত গোটা আমেরিকা। ঘরে ঘরে জ্বলে উঠত মোমবাতি আর লণ্ঠনের মৃদু আলো। থমাস আলভা এডিসন তখন প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে বৈদ্যুতিক বাল্ব উৎপাদন শুরু করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে শুধু বৈদ্যুতিক বাল্ব পৌঁছে দিলেই তো হবে না, পৌঁছে দিতে হবে বিদ্যুৎ সংযোগও।

এডিসন তার ডিসি পাওয়ার (ডিরেক্ট কারেন্ট) ব্যবহার করার চেষ্টা করলেও ত্রুটিপূর্ণ সেই পদ্ধতিতে এত বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব ছিল না। আর তাই, এ সমস্যা সমাধানের দায়িত্বটা তিনি তুলে দেন তরুণ ইঞ্জিনিয়ার নিকোলা টেসলার হাতে। বলেন,
যদি সত্যিই এর সমাধান করতে পারো, তোমার জন্য থাকছে ৫০ হাজার ডলার বোনাস। "

আপাতদৃষ্টিতে যখন মনে হচ্ছিল কাজটা কারো পক্ষেই আর সম্ভব না, কয়েক মাসে অক্লান্ত পরিশ্রমে টেসলা করে ফেললেন এর সমাধান। এডিসনকে এসে মনে করিয়ে দিলেন সেই বোনাসের কথা। জবাবে এডিসন বললেন,

“তুমি হয়তো আমেরিকান সেন্স অফ হিউমার এখনো বুঝে উঠতে পারোনি। ঐ ৫০ হাজার ডলার তো ছিল রসিকতা!” 
(এডিসনরে যদি টুকরা টুকরা করতে পারতাম!)





নানা রকম অসন্তুষ্টি নিয়ে, মাস কয়েক বাদেই চাকরি ছেড়ে, একা কাজ করা শুরু করলেন টেসলা। ডিসি পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশনের ত্রুটি দূর করতে গিয়েই তৈরি করে বসলেন এসি পাওয়ার (অল্টারনেটিং কারেন্ট)। পাল্টে গেল দুনিয়ার বুকে বিদ্যুৎ সরবরাহের চিত্র।

পরবর্তীতে এডিসন টেসলাকে ফিরে পাবার অনেক চেষ্টা করেছেন। এডিসন টেসলার জন্য সপ্তাহে ১০ ডলার থেকে ১৮ ডলার করে বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। কিন্তু টেসলা তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং পদত্যাগ করেন।
এডিসন, টেসলাকে সাথে না পেয়ে তাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন, তার নামে করেছেন অপপ্রচার। কিন্তু উদ্যমী টেসলা এগিয়ে গেছেন আপন গতিতে।

টেসলা এডিসন এর কোম্পানি ছাড়ার পর ১৮৮৬ সালে দুজন ব্যবসায়ির সাথে যোগ দেন। তারা হলেন রবার্ট লেন এবং বেঞ্জামিন ডালে। যারা তার তড়িৎ বাল্ব ও কারখানার জন্য আর্থিক সাহায্য করতে সম্মত হয়। আলোর ব্যবহার এর ডিজাইন এর উপর ভিত্তি করে নিকোলা টেসলা প্রথম তড়িৎ বাতি তৈরি করেন এবং তিনি ডাইনামিক যন্ত্রের ডিজাইন করেছিলেন যা ছিল আমেরিকার প্রথম ডিজাইন। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা নিকোলা টেসলার নতুন ধরনের মোটর এবং বাতির প্রতি তেমন আগ্রহ দেখায় নি। তারা মনে করেছিল যে, তড়িৎ উন্নয়নের চাইতে অন্য কিছু উন্নত করলে ভাল হবে। তারা টেসলাকে টাকা-পয়সা ছাড়াই কোম্পানি থেকে বের করে দিতে চান। টেসলা তার প্রায় সকল ক্ষমতাই হারাতে থাকেন কোম্পানি থেকে। এমন কি তড়িৎ মেরামত এর কাজ মাত্র ২ ডলার এর বিনিময়ে করেন। ১৮৮৬-৮৭ সালের শীতের সময় টেসলা মাথা এবং চোখ এর সমস্যার জন্য অনেক দিন অসুস্থ ছিলেন।  


ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার


এডিসনের কোম্পানি থেকে বেরিয়ে আসার পর অবশ্য তার মূল্যবান প্রকল্পে অর্থলগ্নী করার লোকের অভাব পড়ে নি। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন কোম্পানী, এডিসনের অফিসের অনতিদূরেই টেসলার জন্যে একটি ল্যাব এর ব্যবস্থা করে দেয়। সেখানে টেসলা তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনা পরিচালনা করেন। এখানে তিনি এক্স-রে প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক অনুনাদ, তারবিহীন তথ্য সরবরাহ পদ্ধতিসহ আরও অনেক উদ্ভাবনা নিয়ে কাজ করেন। এখানেই টেসলা এসি মোটর আর এসি পাওয়ার সিস্টেমের উন্নতি ঘটিয়ে নিজের নামে পেটেন্ট করে দেন। এই পেটেন্ট এর ফলে তিনি ৬০,০০০ ডলার ও আরও কিছু আনুষঙ্গিক সুবিধা লাভ করেন। এডিসন ও তার মাঝে চলা “কারেন্টের যুদ্ধ” তিনি অনতিবিলম্বে জিতে যান। ডিসি কারেন্ট এর চেয়ে এসি কারেন্ট অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এসি কারেন্ট ছিলো অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য আর সস্তা। প্রায় বিনামূল্যে এক বিশাল এলাকাজুড়ে জনসাধারণের জন্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রকল্পও তৈরি করেছিলেন তিনি, যদিও তা আর হয়ে ওঠে নি। ১৯০১ সালে এই নিমিত্তে তিনি ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার নির্মান করেন, যা পরে অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায়।  







১৮৮৬ সালের শেষের দিকে টেসলা ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন এর নিয়ন্ত্রক আলফ্রেড ব্রাউন এবং নিউইয়র্কের এটর্নি চার্লস এফ পিক এর সাথে যোগাযোগ করেন। তাদের দুইজনের কোম্পানি চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল এবং আর্থিক সাহায্য করার জন্য তৈরি ছিল। তারা টেসলার কথা শুনে তাকে সাহায্য করতে সম্মত হয়। ১৮৮৭ সালে তারা টেসলার কোম্পানির সাথে একটি চুক্তি করেন। সে অনুযায়ী, ১/৩ অংশ হবে টেসলার, ১/৩ অংশ হবে পিক এবং ব্রাউনের এবং ১/৩ অংশ হবে প্রকল্প উন্নয়নের। তারা একটি গবেষণাগার তৈরি করেন টেসলার জন্য ৮৯ লিফটি রোড, মান্থানে। সেখানে তিনি নতুন ধরনের মোটর জেনারেটর এবং যন্ত্রপাতি উন্নয়নের কাজ করতেন। ১৮৮৭ সালে একটি জিনিসের বেশ উন্নয়ন করেন তা হল তড়িৎ আবেশ মোটর। যা পর্যায়ক্রমিক তড়িৎ এর সাহায্যে দ্রুত চলে। তিনি শক্তির একটি নিয়মে ইউরোপ এবং আমেরিকাতে শুরু করেছিলেন যা বিশাল দূরত্বে ভোল্টেজ এর ট্রান্সমিশন এর জন্য উপকারী ছিল। মোটরে অনেকগুলো তড়িৎ পর্যায় ছিল যা মোটর ঘোরার সময় একটি বৃত্তাকার চুম্বক ক্ষেত্রের তৈরি করতে পারে। আর তাই তড়িৎ মোটরে ১৮৮৮ সালে একটা নতুন ডিজাইন দেয়া হয় যেখানে তড়িৎ প্রবাহের যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না এবং উচ্চ বিস্ফোরণ-রোধক ক্ষমতা সম্পন্ন যান্ত্রিক বাল্ব এর প্রতিস্থাপন করা হয়। ১৮৮৮ সালে টেসলার পর্যায়ক্রমিক তড়িৎ মোটর এবং আবেশ মোটর এর ঘটনা ইলেকট্রিক ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনে প্রকাশ করা হয়। ওয়াশিংটন হাউজ এর তড়িৎ প্রকৌশলীরা জর্জ ওয়াশিংটনকে বলেন যে, টেসলা যে এসি মোটর ও শক্তি ব্যবহার করেন তা ওয়াশিংটন হাউজ এর জন্য প্রয়োজনীয়। ওয়াশিংটন হাউজ তখন ১৮৮৮ সালে ইতালির পদার্থবিদ গেলিলিও এর সাথে তার সাদৃশ্য দেখেন কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে টেসলার।

১৮৮৮ সালে ব্রাউন এবং পিক জর্জ ওয়াশিংটন এর কাছ থেকে টেসলার তড়িৎ মোটর এর পর্যায়ক্রমিক তড়িৎ এর ডিজাইন এর জন্য নগদ ৬০০০০ ডলার এবং প্রতি এসি হর্স শক্তির জন্য আড়াই ডলার চুক্তি করে সমঝোতা করেন। ওয়াশিংটন ১ বছরের জন্য লোনে ২০০০ ডলার (বর্তমানে ৫২,৫০০ ডলার)খরচে প্রতিমাসে তড়িৎ কারখানায় নিয়ে আসেন। সেই বছর টেসলা পিটার্সবার্গে কাজ করেন এবং রাস্তায় গাড়ির শক্তি ব্যবহার করে পর্যায়ক্রমিক তড়িৎ তৈরি করেন। তিনি ওয়াশিংটন হাউজের অন্যান্য প্রকৌশলীদের মধ্যে সবচাইতে শক্তিশালী পর্যায়ক্রমিক তড়িৎ উদ্ভাবন করেন।সেখানে তিনি প্রস্তাব দেন যে, তারা সেখানে ৬০ চক্রে তড়িৎ দিতে পারেন কিন্তু তা রাস্তার গাড়িতে কাজ করবে না।তারা এসি মোটরের ব্যবহার বাড়িয়ে ডিসি মোটরের ব্যবহার কমায়।

রোটেটিং ম্যাগনেটিকফিল্ডের ধারণাও টেসলা দেন প্রথম, ১৮৮২ সালে।১৮৮৮ সালে এসি কারেন্ট প্রদর্শন করেন টেসলা। IEEE তে দেখালেন তিনি। সবাই ব্যাপারটা দেখে অবাক হল, ভালভাবেই নিল এই প্রথম। এমনকি ৬০০০০ ডলারের অফার পেলেন পর্যন্ত।কিন্তু এতে এডিসনের মাথা গরম হয়ে গেল, টেসলার এসি কারেন্ট বাজার পেয়ে গেলে এডিসনের ডিসি কারেন্ট যে মার খেয়ে যাবে।

এডিসন এসি কারেন্টকে নামদিয়েছিলন “ডেথ কারেন্ট”; এডিসন লোকাল ছেলেদের পার হেড ২৫ সেন্ট করে দিলেন জীবিত কুকুর আর বিড়াল এনে দেবার জন্য।সেই কুকুর বিড়াল আর একটা হাতি পর্যন্ত পাব্লিকলি এডিসন “টেসলার” এসি কারেন্ট দিয়ে ইলেক্ট্রোকিউট করে মারেন। সবাইকে বোঝানোর জন্য যে, এসি কারেন্ট বিপজ্জনক। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও পারলেন না। ১৮৯২ এর মধ্যে নিজের কোম্পানির হেড পদটাও হারিয়ে ফেললেন এডিসন।





১৮৯৪ সালে টেসলা কাজ শুরুকরলেন অদৃশ্য তরঙ্গ নিয়ে। কিন্তু সেটার পেটেন্ট বা কিছুই নেন নি। ১৮৯৫ সালে উইলিয়াম রঞ্জেন সে অদৃশ্য তরঙ্গের নাম দেন এক্স-রে। তখন টেসলা বলেন, তিনি এটা নিয়ে কাজ করছিলেন।১৮৯৫ সালে, তার ল্যাবের সব কিছু (প্রায় ৫০ হাজার ডলারের জিনিস) আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে যায়। তাই তার এক্স-রের কোন কাজ তিনি দেখাতে পারেন নি। আবার নতুন করে শুরু করেন।রঞ্জেন যখন এক্সরে নিয়ে কাজ করলেন, তখন মানুষ ভেবেছিল এক্সরে-র বুঝি হিলিং ক্ষমতা আছে। কিন্তু টেসলা বললেন, এই তরঙ্গ ডেঞ্জারাস। এটা যেন মেডিকালে ব্যবহার করা না হয় এখনও। কিন্তু কে শোনে কার কথা। টেসলার এক্সরে নিয়ে ইন্টারেস্ট শুনে এডিসন লেগে গেলেন এক্সরে নিয়ে। একদম মেডিকাল কাজে। তার এক এমপ্লোয়ি ক্ল্যারেন্স ডালি এত বেশি এক্সরে-তে এক্সপোজড হন যে, তারহাত কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। তাতেও লাভ হয়নি। ক্যান্সারে মারা যান তিনি। তাছাড়া নিজেও নিজের উপর এক্সরে নিয়ে কাজ করলেন, চোখে বারবার এক্সরে মারতে লাগলেন। প্রায় অন্ধই হয়ে গিয়েছিলেন। ১৯০৩ সালে এক্সরে নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “খবরদার আমার সাথে এক্সরে নিয়ে আলাপ করবে না। আমি ভয় পাই এক্সরে।”
 







ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন তথা তারবিহীন শক্তি সঞ্চালনা ছিল টেসলার বিশেষ আগ্রহের জায়গা। রেডিও উদ্ভাবনের জন্য ১৯০৯ সালে ইতালিয়ান বিজ্ঞানী গুলিয়েলমো মার্কনি যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেলেও, তার আগেই রেডিও উদ্ভাবন করেছিলেন টেসলা। ১৮৯৫ সালে এক পরীক্ষা চলাকালে দুর্ঘটনায় তার ল্যাবরেটরি ও সেই ল্যাবে থাকা তার রেডিও বিষয়ক গবেষণা পত্রগুলো আগুনে পুড়ে যায়। সুদীর্ঘ ৬৪ বছর পর, ১৯৪৩ সালে ইউএস সুপ্রিম কোর্ট মার্কনির রেডিও পেটেন্টকে অকার্যকর ঘোষণা করার পাশাপাশি নিকোলা টেসলাকে রেডিওর প্রকৃত উদ্ভাবক হিসেবে ঘোষণা করে।
জীবনের জটিলতাকে সহজ চোখে দেখে সহজ করার প্রয়াস ছিল টেসলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও পরিবেশবান্ধব করার চেষ্টা থেকেই একসময় টেসলার নজরে আসে কানাডা অন্টারিওতে অবস্থিত নায়াগ্রা ফলস। হাইড্রোইলেক্ট্রিসিটির প্রথম ধারণা দেন টেসলা। তিনিই নায়াগ্রা ফলস থেকে প্র্যাক্টিকাল এনার্জি সোর্স বানানোর কথা বলেন।প্রাকৃতিক এ জলপ্রপাত থেকে প্রতি সেকেন্ডে ১৫০ হাজার গ্যালন পানি নেমে আসে। আর এর শক্তিকে ও টেসলার ট্রান্সফর্মার কাজে লাগিয়েই শুরু হয় উচ্চশক্তি উৎপাদনশীল হাইড্রোইলেক্ট্রিক পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এ অনন্য উদ্ভাবনের সম্মাননা ও স্বীকৃতির স্মারক হিসেবে নায়াগ্রা ফলসের পাশে টেসলার একটি ভাস্কর্যও রয়েছে।  

 



আমরা জানি, ১৯৩৫ সালে রবার্ট ওয়াটসন ওয়াট আবিষ্কার করেন রাডার। অথচ, ১৯১৭ সালেই সেটার থিওরি দিয়ে যান টেসলা। প্রশ্ন জাগতেই পারে কেবল থিওরি দিয়েই শেষ কেন? করে দেখালেন না কেন? জি না।তিনি করতে গিয়েছিলেন। তখন প্রথম মহাযুদ্ধ চলছিল। ইউ এস নেভির জন্য এই টেকনোলোজি প্রস্তাব করেছিলেন।কিন্তু  ইউনেভির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এর প্রধান ছিলেন এডিসন।তিনি টেসলা নাম দেখেই অফার রিজেক্ট করে দেন। মারা গেল এই টেকনোলোজি।  







ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিনিয়ারিং উদ্ভাবনের অর্ধ শতক আগেই সেটা নিয়ে কাজ করছিলেন নিকোলা টেসলা!

১৮৯১ সালের ৩০ জুলাই, ৩৫ বছর বয়সে টেসলা আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভ করেন। তিনি দক্ষিণের ৫ম এভেনিউতে একটি গবেষণাগার তৈরি করেন এবং পরে ৪৬ই হাউজটন রোড,নিউইয়র্কে।তিনি তারবিহীন শক্তিশালী ট্রান্সমিশন বসান এবং তারের মাধ্যমে উভয় জায়গাতে বাতি বসান। একই বছর তিনি টেসলা কয়েল উদ্ভাবন করেন। তিনি আমেরিকান ইনস্টিটিউট অফ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর সহকারী প্রধান হন(১৮৯২-১৮৯৪) পর্যন্ত। যা আধুনিক (আই ইইই) ইনস্টিটিউট অব রেডিও ইঞ্জিনিয়ারস নামে পরিচিত।ট্রাঞ্জিস্টর বানানোর উপকরণগুলোর পেটেন্ট কিন্তু টেসলারই ছিল। আজকের কম্পিউটার আসতই না এটা ছাড়া।

বহির্বিশ্ব থেকে প্রথম রেডিও ওয়েভ ধরেন টেসলা।পৃথিবীর রেজোন্যান্ট ফ্রিকুয়েন্সি আবিষ্কার করেন টেসলা।  




বল লাইটনিং বলে একটা জিনিস আছে। মাটির কয়েক ফিট উপরে ভেসে থাকে। এটাও সেই ১৮৯০ এর দশকে টেসলা করে দেখিয়েছিলেন।
তিনি এমন একটি Airship এর কথা বলেন যার গতি হবে এতই বেশি মাত্র ৩ ঘণ্টায় New York City এ যেতে London পারবে কিন্তু এই আবিষ্কারটির সমস্ত মডেল, ডকুমেন্ট মৃত্যুর পরে হারিয়ে যায়।  



 



নিকোলা টেসলা সেই সময়েই এমন একটি ক্যামেরা তৈরির কথা বলেছিলেন যা মানুষের চিন্তা শক্তি থেকে ডাটাতে কনভার্ট করে সেই গুলোকে দেখা যাবে একটি স্ক্রিনে, এমন একটি প্রজেক্ট। কিন্তু তিনি আর্থিক কারণেপ্রজেক্ট সফল করতে পারেননি। সম্ভব হলে মানুষের কোনো কিছুই আর গোপন থাকতো না।  






প্রজেক্ট রেইনবো বা টেলিপরটেশন। এটি ছিল World War 2 এর সময়ের একটি প্রজেক্ট। আমেরিকার নৌবাহিনী জাহাজ অদৃশ্য করে শত্রু বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই প্রজেক্ট এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো নিকোলা টেসলাকে। সেই প্রজেক্ট এ নিকোলা টেসলার অধীনে আলবার্ট আইনস্টাইনকেও টিম মেম্বার করা হয়। নিকোলা টেসলা ছোট একটি Boat এর ক্ষেত্রে সার্থক হয়েছিলেন। নিকোলা পুরোপুরি অদৃশ্য করে ফেলেন সেটিকে। কিন্তু এই পরীক্ষাটি করে সফল হওয়ার পর কিছু ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর নিকোলা টেসলা প্রজেক্ট থেকে অব্যাহতি নেন এনং তিনি নিষেধ করেছিলেন আইনস্টাইন সহ বাকি যে মেম্বরদেরকে যাতে এই বড় জাহাজ এর ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাটি না করা হয়। কিন্তু তার পরেও পরীক্ষাটি করা হয়েছিলো জাহাজে কয়েকজন ক্রুসহ। পরে জাহাজটি অদৃশ্য হয়েছিল ঠিকই কিন্তু জাহাজে অবস্থিত ক্রুদের বিগলিত লাশ, কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্যহীন, এবং কাউকে জাহাজের দেয়ালে অর্ধেক শরীর ঢুকে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায়। নিকোলা টেসলা কিন্তু আগে থেকেই এর ভয়াবহতা কল্পনা করেছিলেন।

১৯১১ সালে New York এর একটি ম্যাগাজিনকে বলেন নিকোলা টেসলা আরও একটি Flying Matching নিয়ে কাজ করছিলেন যেটি দেখতে (UFO) এর মত হবে এবং যেকোন দিকে যেকোন গতিতে ছুটতে পারবে। এটি আকাশে ওড়ার সময় গ্রাভিটি শুন্য হয়ে পড়বে এবং বাতাসে স্থির অবস্থায় রাখা যাবে। কিন্তু এই মেশিনটিতে না থাকবে কোন পাখা না থাকবে কোন উইংস।

নিকোলা টেসলা একমাত্র বিজ্ঞানী যিনি Time Machine নিয়ে কাজ করেছিলেন সবার প্রথম। অনেকেই মনে করেন তিনি টাইম মেশিন তৈরি করে ফেলেছিলেন।

Nikola Tesla এর যে কয়টি ভয়াবহ আবিষ্কারের কথা বলে ছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল Death Ray .  এটি এমন একটি যন্ত্র যা ২৫০ মাইল দূর থেকে ১০ হাজার যুদ্ধ বিমানকে এক সাথে ধ্বংস করে দেয়ার ক্ষমতা রাখতে পারতো এবং যে কোন যুদ্ধকে শেষ করে দিতে পারতো। অনেকে বলেন তিনি এই যন্ত্রটি তৈরিও করে ফেলেছিলেন কিন্তু এটি দিয়ে মানুষ পৃথিবী ধ্বংস করে দেবে চিন্তা করে এই যন্ত্রটিকেও তিনি নষ্ট করে ফেলেন। তাঁর ল্যাবে একাধিকবার আগুন লেগে অনেক আবিষ্কারের ডকুমেন্টই পুরে গেছিলো।  

1893 সালে নিকোলা টেসলা এমন একটি মেশিন তৈরি করেন যা দিয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করে ফেলেছিলেন। সেটা চালু করার পর নিউ ইয়র্কের একটা নেইবরহুড প্রায় ধ্বংসই হয়ে যায়! এটি মূলত ছিল একটি Oscillator যার নাম দিয়েছিলেন “Tesla Oscillator” এবং তিনি অনুভব করেছিলেন তাঁর যন্ত্রটিকে যদি খুব বড় পরিসরে তৈরি করা হয় পুরো পৃথিবীতে ভূমিকম্প সৃষ্টি করা যেতে পারে। মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে তিনি নিজের হাতে হাতুরি দিয়ে ভেঙ্গে ফেলেছিলেন এবং আবিষ্কারটিও হারিয়ে যায়।  


টেসলা অসিলেটর
 

নিকোলা টেসলা রিমোট প্রযুক্তির জনক ছিলেন। তিনি একটি খেলনা নৌকাকে দুর নিয়ন্ত্রিত ভাবে চালাতে গিয়ে একসাথে ৩ টি আবিষ্কার করে ফেলেন।
 ১. পৃথিবীর সর্বপ্রথম রিমোট, ২.পৃথিবীর সর্বপ্রথম রোবট, ৩.পৃথিবীর সর্বপ্রথম গাইডেড মিসাইল সিস্টেম। রিমোট কনট্রোল  আবিষ্কার করেন টেসলা।নিওন লাইট  উদ্ভাবন করেন টেসলা।আজকের ইলেকট্রিক মোটর টেসলা।  

পার্টিকেল বিম



টেসলা প্রাকৃতিক সম্পদের দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে বেশ সোচ্চার ছিলেন এবং পুনরায় ব্যবহারযোগ্য জ্বালানীর সমর্থক ছিলেন। তাছাড়া তিনি কীভাবে প্রাকৃতিক শক্তি ব্যবহার করে জীবাশ্ম জ্বালানীর উপর থেকে চাপ কমানো যায় সেই বিষয়েও বহু গবেষণা করেছেন। এমনকি তিনি তার জিনের ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম বীজ তৈরি করার মতোও সফল গবেষণাও তার রয়েছে।
এমনকি আজকের তারহীন প্রযুক্তিও কিন্তু টেসলারই আবিষ্কার।

এটা নিয়ে একটা মজার ঘটনা মনে পড়েছে। ১৮৯৮ সালে wireless tech দিয়ে তিনি একটা নৌকা চালিয়ে দেখিয়েছিলেন দূর থেকে। ম্যাডিসন স্কয়ারের পাব্লিক প্রদর্শনী। লোকজন তো সেটা দেখে আকাশ থেকে পড়ল। এমনকি “জাদু”,“টেলিপ্যাথি”, “ভিতরে কোন বানর চালাচ্ছে”- এগুলো বলতেও থামেনি।

টেসলা রেডিও কনট্রোল টর্পেডো দিতে চেয়েছিলন ইউএস নেভিকে। তারা
ইন্টারেস্ট দেখায়নি তখন।
টেসলা কৃত্রিম বজ্রপাত produce করেছিলেন। সেটারশব্দ এত জোরে হয়েছিল যে ১৫ মাইল দূরে কলোরাডো থেকেও শোনা গিয়েছিল। ১৩৫ ফিট লম্বা মিলিওন ভোল্টের বজ্র। রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানুষ দেখল তাদের পায়ের আশপাশে স্ফুলিঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। পানির লাইন থেকে লাইনে স্ফুলিঙ্গ খেলা করছে। ঘোড়া ছোটাছুটি করছে। প্রজাপতিরা ইলেক্ট্রিফাইড হয়ে যায়, তারা উড়ছে আর তাদের চারপাশে নীলাভ আলোজ্বলছে।


টেসলা দাবি করেছিলেন তিনিচাইলে পৃথিবীতে এমন ভূকম্পন সৃষ্টি করতে পারবেন যে পুরো মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে।এমনকি পুরো পৃথিবীকে দুইভাগে স্লাইস করে ফেলতে পারবেন।টেসলা কথা বলতে পারতেন আটটা ভাষায়। সারবিয়ান, ইংলিশ্‌ জার্মান, চেক, ফ্রেঞ্চ, হাঙ্গেরিয়ান, ইতালিয়ান আর লাতিন।নিকোলা টেসলাকে শুধু জিনিয়াস বললে কম হয়ে যাবে। যুগের চেয়ে এগিয়ে থেকে যুগান্তকারী সব আইডিয়া বের করা এবং সেগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়ার চেষ্টাই যেন ছিল টেসলার জীবনের সারাংশ। ২০০২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে সিআইএর একটি বেনামি ড্রোন চালনার মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মতো বিশ্ববাসী পরিচিত হয় চালকবিহীন এ যানের সাথে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বহুকাল আগেই টেসলা তৈরি করেছিলেন ড্রোন প্রোটোটাইপের ডিজাইন। এছাড়াও তার অবিশ্বাস্য গবেষণাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ডেথ রে বা পার্টিকেল বিম ওয়েপন যেটা আগেই বলেছি। ছিল “ইলেক্ট্রো-স্ট্যাটিক এনার্জি ওয়াল”, যা ব্যবহার করে একটি দেশকে যেকোনো বহিরাগত আক্রমণ থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
১৯২৮ সালে তিনি প্লেন বানান যেটা vertically উড্ডয়ন করতে পারত! এটাই ছিল তার লাস্ট পেটেন্ট।  




যে আলোক-দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে অমানিশার বিস্তীর্ণ ললাটে, তার ওপর থেকে কি আর সরানো যায় নজর? একদমই না। আর তাই, প্রায় ৬০টি বসন্ত আমেরিকায় কাটিয়ে দিলেও, তার জীবন কিন্তু সেখানে মোটেই সহজ ছিল না। ধারণা করা হয়, টাইম ট্রাভেল করা যায় এমন যন্ত্র তথা টাইম মেশিন থেকে শুরু করে ডিস্ক শেপের এয়ারক্রাফট (ফ্লাইং সসার) সহ বিভিন্ন অদ্ভুত সব গবেষণা করেছেন তিনি। ডিস্ক শেপের এয়ারক্রাফটের জন্য তিনি পেটেন্ট অ্যাপ্লিকেশনও করেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন অজুহাতে তার অনুমোদন দেয়া হয়নি।

এসব সিক্রেট রিসার্চে তিনি এতটাই অগ্রগামী ছিলেন যে, একের পর এক অভাবনীয় উদ্ভাবন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়া টেসলাকে সবসময়ই থাকতে হয়েছে আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনগুলোর রাডারে। তার অসামান্য মেধা, জ্ঞান ও উদ্ভাবন-ক্ষমতা হয়তো তিনি আমেরিকার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারেন, এ আশঙ্কায় কড়া নজরদারিতে রাখা হতো তাকে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের পক্ষে কাজ করার মতো সন্দেহমূলক অভিযোগও প্রকাশ করেছিল বেশ কিছু সংস্থা।

তার বেশিরভাগ উদ্ভাবনী ধারণাই অন্যেরা নিজের নামে চালিয়ে পেটেন্ট করে নিয়েছে। তাদের সম্পর্কে টেসলা বলেন, “তারা আমার ধারণা চুরি করুক, এতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি শুধু বলি, তাদের নিজেদের কোনো ধারণা আসে না কেন?”
টেসলার ছিলো এক অনন্য সাধারণ ক্ষমতা। যেকোনো ডিজাইন তৈরী হবার আগে তিনি সেটির ত্রিমাত্রিক একটি প্রতিরুপ মানসচক্ষে দেখতে পেতেন। বুদাপেস্টে থাকাকালীন একদিন পার্কে বন্ধুর সাথে হাঁটছিলেন আর কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। অকস্মাৎ তার মনে একটি ছবি ভেসে উঠলো। সেখানেই কাঠি দিয়ে ধূলোর উপরে এঁকেছিলেন তার অনেক সাধনার ধন, সেই বিখ্যাত এসি মোটরের চিত্র। পরবর্তীতে এসি মোটর উদ্ভাবনের পর তিনি বলেছিলেন, তিনি আসলে নতুন কিছু করেন নি, তার সেই মানসপটের প্রতিলিপিকেই বাস্তব রুপ দান করেছেন মাত্র!  



আজীবন অবিবাহিত টেসলা কখনো কোনো নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছেন বলে জানা যায় নি। নারীদের তিনি সবদিক দিয়ে পুরুষের চেয়ে উচ্চতর মনে করতেন। নিজেকে কখনো কোনো নারীর যোগ্য মনে করেন নি তিনি। কোন নারীর সাথে ঘনিষ্টতাও দেখা যায় নি কোনদিন। তার ধারণা ছিল এটা তার কাজের ক্ষতি করবে। অথচ অনেক নারী তার জন্য পাগল ছিল, কী না করেছে তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য।কিন্তু টেসলার পাত্তা পায়নি।
তিনি বলেছিলেন,“I do not think you can name many great inventions that have been made by married men.”



তাছাড়া তার মতো কাজপাগল মানুষের জন্যে একটি একাকী জীবন জরুরীও ছিলো। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যবিহীন টেসলা সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন শুধু মানুষের কল্যাণের জন্য।








শোনা যায় যে টেসলার হাতে ছিলো এই মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যের চাবি। তিনি জানতেন এর গোপনীয়তার গোপনতর সূত্র। আর সে রহস্য উন্মোচনের মূলমন্ত্রও তিনি বলে গেছেন। তিনি বলেন, “যদি তুমি ৩, ৬, ৯ এই তিনটি সংখ্যার মাহাত্ম্য বোঝ, তো তোমার হাতে মহাবিশ্বের চাবি থাকবে।” তিনি আরও বলেন, “যদি মহাবিশ্বের রহস্য জানতে চাও, তাহলে শক্তি, কম্পন আর কম্পাঙ্কের ব্যাপারে চিন্তা করো।” টেসলা দাবী করতেন রাতে মাত্র ২ ঘণ্টা ঘুম ই তার জন্য যথেষ্ট। তবে এর কারণ অস্পষ্ট। তিনি আসলেই ২ ঘন্টা ঘুমাতেন কিংবা এর বেশি ঘুমাতে পারতেন কি-না; এ বিষয়ে সঠিক কিছু জানা যায়নি।
টেসলা সংখ্যা ৩ এর ব্যাপারে অতি মাত্রায় আচ্ছন্ন ছিলেন। এবং রাতের খাবারের পূর্বে ১৮টি(৩ দ্বারা বিভাজ্য) রুমাল দ্বারা তার ডাইনিং রুম পরিষ্কার করতেন। এছাড়া তিনি বৃত্তাকার বস্তু, গহনা এবং চুল স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতেন।
তাঁর দার্শনিক চিন্তা ভাবনার ফল স্বরূপ তিনি মহাজাগতিক রশ্মির উপর গুরুত্বপূর্ণ সব গবেষণা করে গেছেন। জীবনের শেষ ভাগে তিনি আধ্যাত্মিক দর্শন নিয়ে উৎসাহী হয়ে পড়েন। বিশ্ব ধর্মমহাসভায়, বিবেকানন্দের চিকাগো বক্তৃতার দিন, নিকোলা টেস্‌লা সভাগারে উপস্থিত ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে স্বামীজির বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হন। তাঁর মনে হয়, সৃষ্টির উৎস ও অন্ত নিয়ে নিজের মনে যে বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার উদয় হয়, আশ্চর্যরকম ভাবে হিন্দু বেদান্ত দর্শনে দেওয়া আছে তার ইঙ্গিত।  



 

এতে টেসলার অনুসন্ধানী মন যেন নতুন দিশা পেয়ে গেল। তিন বছর স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকা বাস করেন। ১৮৯৫ সালে তিনি একটি ফ্রেঞ্চ নাটক দেখতে যান। সেই নাটকে একটি মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন প্রখ্যাত ফরাসি অভিনেত্রী সারা বার্নার্ড। প্রেক্ষাগৃহে সেদিন নিকোলা টেসলাও ছিলেন। সারা বার্নার্ড প্রেক্ষাগৃহে বিবেকানন্দকে দেখতে পান। নাটক শেষ হতেই দেখা করে স্বামীজিকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। টেস্‌লার সাথে সারা বার্নার্ডের বন্ধুত্ব ছিল। তাই টেসলাও সেই নৈশভোজে আমন্ত্রিত হন।

স্বামীজি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের বিষয়ে চিরকালই উৎসুক ছিলেন। নিকোলা টেসলার গবেষণা তাঁকে কৌতূহলী করে তোলে। দুই প্রবাদ পুরুষ বিজ্ঞান ও হিন্দু দর্শন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। আলোচনার মাধ্যমে বিবেকানন্দ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে জড় ও শক্তি, একে অন্যতে পরিবর্তিত হওয়া সম্ভব। টেস্‌লা সম্মতি জানান যে তিনি বল ও জড়পদার্থের সমন্বয়কে শক্তিতে পরিবর্তনের প্রমাণ দেবেন অঙ্ক কষে। টেস্‌লা সংস্কৃত পড়তে শিখেছিলেন কিনা সে বিষয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় না, তবে তার লেখায় দুটি সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার করে গেছেন, প্রাণ ও আকাশ। সংস্কৃত শব্দ ‘আকাশের’ সঠিক অর্থ টেস্‌লা তাঁর ক্ষুরধার মেধা দিয়ে বুঝেছিলেন। আকাশ, অর্থাৎ জড়। প্রচলিত ধারনা ছিল বেদান্তে ‘আকাশ’ শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে ইংরাজিতে ‘ইথার’ অর্থে। প্রাণকে তিনি আখ্যা দেন শক্তি হিসাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত টেস্‌লা ওই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে দেখাতে অসমর্থ হন।

১৯১৫ সালের ৬-ই নভেম্বর রয়টার্স খবর সংস্থা লন্ডন থেকে খবর দেয় যে, ১৯১৫ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পাবেন থমাস এডিসন এবং নিকোলা টেসলা।এটি নিঃসন্দেহে একটি গুজব ছিল। মারকোনি নোবেল প্রাইজ পেলেও টেসলা কোনদিন নোবেল পাননি। খুশির কথা, এডিসনও পাননি (xD)



নিকোলা টেসলার শেষ বয়সের শখ ছিল কবুতরকে খাওয়ানো। ১৯৩৭ সালের শরতে, মধ্যরাতে তিনি নিউ ইয়রকার হোটেল থেকে ক্যাথিড্রাল আর লাইব্রেরির আশপাশের কবুতরদের খাওয়ানোর জন্য বের হন। এমন সময় রাস্তায় এক ট্যাক্সিক্যাব তাকে ধাক্কা দেয়। তিনি পড়ে যান। তার মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড আঘাত পড়ে। তিনটা পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে যায়।টেসলা সারাজীবন ডাক্তার দেখান নি, এটা তার একটা জেদ ছিল। এবারও তিনি ডাক্তার দেখাবেন না বলে জেদ করলেন।তাই তার আসলে কী কী ক্ষতি হয়েছিল আমরা জানি না।টেসলা জানতেও চাইলেন না কে তাকে ধাক্কা দিল, কেবল একটা ক্যাব ডেকে তাকে হোটেলে নিয়ে যেতে বললেন। কয়েক মাস শয্যাশায়ী। তার দুঃখ ছিল যে, তিনি কবুতর খাওয়াতে পারছেন না।
১৯৩৮ সালের বসন্তে টেসলা দাঁড়াতে পারলেন। আবার শুরু করলেন কবুতরদের খাওয়ানো।

এই হোটেলেরই ৩৩২৭ নাম্বার রুমে ১৯৪৩ সালের ৭ জানুয়ারি মারা যান এই “পাগল বিজ্ঞানী”।

দুই দিন আগে “DO NOT DISTURB” সাইন টানিয়ে দিয়েছিলেন দরজায়। সেই সাইন উপেক্ষা করে হোটেলের মেইড অ্যালিস ভিতরে ঢুকে পড়েন।ঢুকে লাশ আবিষ্কার করেন। করনারি থ্রম্বসিস ছিল তার মৃত্যুর কারণ।

মারা যাবার দুদিন পর এফবিআই তার সব সম্পদ জব্দ করে। এক এমআইটি প্রফেসরকে দিয়ে তার গবেষণার জিনিসপত্র চেক করিয়ে নেয়। প্রফেসর রিপোর্ট করেন যে, ডেঞ্জারাস কিছুই নেই।

টেসলার শেষ কাজটা ছিল কী জানেন? একটা টাওয়ার বানানো যেটা থেকে মানুষ ফ্রি ওয়্যারলেস এনার্জি পাবে। তার স্বপ্ন ছিল একদিন সারা বিশ্ব এভাবে ফ্রি এনার্জি পাবে। কিন্তু সেই টাওয়ার বানানো শেষ করার পর যখন নির্মাতা জানতে পারলেন এটাতে তার আর্থিক লাভ নাই, তখন তিনি টাওয়ার শাট ডাওন করে দিলেন। পুরো বাজেট লস।টেসলা মারা যান দরিদ্র আর ঋণী অবস্থায়। দুধ আর নাবিস্কো বিস্কুট খেয়েই শেষ দিনগুলো পার করছিলেন সেই হোটেলে।
শেষ বয়সে এক ইন্টার্ভিউতে তিনি বলেছিলেন, এক আহত কবুতর প্রতিদিন তার কাছে আসত। তিনি ২০০০ ডলার খরচ করে সেইকবুতরের জন্য একটা ডিভাইস বানিয়েছিলেন তাকে heal করার জন্য। ধীরে ধীরে সেই কবুতরের পাখা আর হাড় ঠিক হয়ে আসে।পৃথিবীতে খুব কম মানুষের ফটোগ্রাফিক মেমোরি আছে। টেসলা তার একজন। পুরো বই তিনি মুখস্ত বলতে পারতেন! হাজার হাজার ডিজাইন তিনিসম্পূর্ণ মনের মধ্যে করে ফেলতে পারতেন। কোনদিন হাতে লিখতেন না। আঁকতেন না। মেমোরি থেকেই সব করে ফেলতেন। কোন ডাইমেনশন কত হবে সব হিসেব নিকাশ মাথাতে করে ফেলতে পারতেন।১৮৯২ থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত নিকোলা টেসলা IEEE (তখন ছিল AIEEE) এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
মধ্য বয়সে তিনি লেখক মার্ক টোয়েনের বন্ধু হয়ে যান। অনেকটা সময় তারা একসাথে কাটিয়েছেন। মার্ক তার ইন্ডাকশন মোটর দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বিদ্যুৎ তৈরি করতে গিয়ে টেসলা একদিন এমন এক যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেন, যেটি চালু করলেই ম্যানহাটনে তার বাসা এবং প্রতিবেশীদের বাসাও কেঁপে উঠতো। টেসলা ভাবলেন, তিনি সম্ভবত ‘ভূমিকম্প যন্ত্র’ আবিষ্কার করে ফেলেছেন। পরে দেখলেন, তিনি আসলে একটা উচ্চ কম্পাঙ্কের দোলক (High Frequency Oscillator) তৈরি করে ফেলেছেন। এই দোলক দিয়ে মার্ক টোয়েনকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতেও ফেলেছিলেন তিনি। একটা পার্টি শেষে টোয়েনকে ঐ দোলকের প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়াতে বলে সেটি চালু করে দিলে প্রচণ্ড কম্পনে ১ মিনিটের মাঝেই টোয়েনের অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যায়।






১৯৩১ সালে এডিসন মারা যাবার পর, নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় শত শত স্তুতিবাক্যের ভীড়ে এডিসনের নামে একমাত্র নিন্দাটা ছিল টেসলার। সারা জীবনের ক্ষোভ তিনি সেখানে মিটিয়ে নেন বটে। তার সম্মানে ম্যাগনেটিক ফ্লাক্স ইন্টেন্সিটির এসআই একক রাখা হয় “টেসলা”।



টেসলা কোনদিন দু ঘণ্টার বেশি ঘুমাতেন না। তবে মাঝেমধ্যে “ঝিমাতেন”, তার মতে এটা নাকি তার “ব্যাটারি রিচারজ করে”; স্কুলে থাকতে ৪৮ ঘণ্টা টানা বিলিয়ার্ড খেলেছিলেন। একবার ল্যাবে ৮৪ ঘণ্টা একটানা কাজ করে বের হয়েছিলেন। কিছুই হয়নি তার।






" বিজ্ঞানীরা তাৎক্ষনিক কোন ফলাফলের জন্য গবেষণা করেন না। তারা গবেষণা করেন ভবিষ্যতের জন্য, ভবিষ্যতের উন্নতির জন্য।"  
 
নিজ হোটেল কক্ষে যে রাতে তার মৃত্যু হলো, ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হয়েছিল আরও নতুন কিছু রহস্য।নামী-দামী বিলাসবহুল হোটেলে থাকতে পছন্দ করতেন টেসলা। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পাশাপাশি নিজের সব ডকুমেন্টও সবসময় সাথে সাথেই রাখতেন। তখনও চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ইতিমধ্যেই টেসলা দাবী করেছিলেন “ডেথ রে” নামক এক অতিশক্তিশালী পার্টিকেল বিম ওয়েপনের কথা, যা চলমান যুদ্ধে রাখতে পারে বড় রকমের ভূমিকা। আর সেজন্যই ১৯৪৩ সালের ৭ই জানুয়ারি, টেসলার মৃত্যুর খবর শোনার সাথে সাথে এসব টেকনোলজি আমেরিকার শত্রুপক্ষের হাতে পড়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে, নিউ ইয়র্কের সেই হোটেল রুমটি সিল করে এফবিআই। ভেতরে টেসলার ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের সাথে ছিল অসংখ্য নথিপত্র। কিন্তু যে মানুষটি বদলে দিয়েছে সভ্যতার গতিপথ, তার গবেষণাকর্ম সাদা চোখে বোঝা কি আর এতই সহজ?
শুরুতে যে চমকের কথা বলেছিলাম তাঁর কথা বলব এখন ।৮৬ বছর বয়সী মহান এ বিজ্ঞানীর সব নথিপত্র পরীক্ষা নিরীক্ষার দায়িত্বটা  এফবিআই তখন তুলে দিয়েছিল কার হাতে জানেন?
 জন জি. ট্রাম্পের হাতে।
 





জন জর্জ ট্রাম্প ছিলেন ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি) এর একজন অধ্যাপক। ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আর হ্যাঁ, এই জন ট্রাম্পই ছিলেন আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আপন চাচা।
 ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে প্রকাশিত এক মেমোরিয়াল ট্রিবিউট থেকে জানা যায়, প্রফেসর রবার্ট জে ভন ডি গ্রাফের অধীনে কাজ করার উদ্দেশ্যে জন ট্রাম্প এমআইটি-তে যোগ দিয়েছিলেন। প্রফেসর রবার্টকে বলা হতো “সুপার হাই ভোল্টেজ জেনারেশন ও অ্যাপ্লিকেশনের নতুন খাত” এর অগ্রদূত। তার অধীনে ১৯৩৩ সালে ডক্টরেট সম্পন্ন করার পর ১৯৩৬ সালে তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে এবং পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে পরিপূর্ণ অধ্যাপক হিসেবে এমআইটিতে যোগদান করেন.দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এমআইটির রেডিয়েশন ল্যাবে ফিল্ড সার্ভিসেস ডিরেক্টর হিসেবে মাইক্রোওয়েভ রাডার নিয়ে কাজ করার পর রেডিয়েশন ল্যাবের ব্রিটিশ ব্রাঞ্চে তার পোস্টিং হয়। সেখানে তিনি সরাসরি জেনারেল ডুইট ডি. আইজেনআওয়ারের সাথে কাজ করার সুযোগ পান।
হাই ভোল্টেজ ও রেডিয়েশন নিয়ে কাজ করার দক্ষতা থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের কাছে ট্রাম্পের বিশেষ কদর ছিল। এছাড়াও বিভিন্ন গোপন সরকারী প্রোগ্রামে কাজ করার ব্যাপারেও ছিল তার বিশেষ সুনাম। ১৯৪৩ সালের ১৩ই জানুয়ারি, নিকোলা টেসলার মৃত্যুর পর তার ব্যক্তিগত কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার গুরুদায়িত্বটাও তাই বিশেষভাবে তাকেই দিয়েছিল এফবিআইয়ের অফিস অফ এলিয়েন প্রোপার্টি কাস্টোরিয়ান।
নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষার পর শেষ পর্যন্ত জন তার রিপোর্ট জমা দেন। নিত্য নতুন অবিশ্বাস্য গবেষণা, আবিষ্কার ও উদ্ভাবনে বিশ্ববাসীকে চমকে দেয়া মানুষটির গোপন সব নথিপত্রে কী লুকনো আছে, তা নিয়ে কারোরই উৎকণ্ঠার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু, প্রায় ৬ সপ্তাহের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জন তার রিপোর্টে টেসলার রেখে যাওয়া কাগজপত্রকে কাল্পনিক, দার্শনিক ও প্রচারণামূলক বলে আখ্যায়িত করেন। পাশাপাশি, সেসব কাগজে নতুন কোনো তত্ত্ব কিংবা পদ্ধতির উল্লেখ নেই বলেও এফবিআইকে জানান।  





ড. ট্রাম্পের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এফবিআই তখন টেসলার পার্টিকেল ওয়েপন বিম (ডেথ রে) এর অস্তিত্বকে গুজব ও কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু তা মেনে নেয়নি অনেকেই। টেসলার জীবনী ‘উইজার্ড: দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অফ নিকোলা টেসলা’র লেখক মার্ক সাইফার বলেন,
“ইউএস মিলিটারির ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এল.সি.ক্রেইগসহ অনেকেই এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করতেন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস পার্টিকেল বিম ওয়েপনের অস্তিত্ব অবশ্যই আছে।”
এছাড়াও রয়েছে ওয়্যারলেস ইলেক্ট্রিসিটি ট্রান্সমিশন সিস্টেম। ভেবে দেখুন তো, এখনকার সময়ে কোনো তারের সংযোগ ছাড়াই আমরা যেভাবে ফোন/ ট্যাব/ ল্যাপটপে ওয়্যারলেস ইন্টারনেট (যেমন: ওয়াইফাই) চালাচ্ছি, তেমনি যদি তার ছাড়াই দেয়া যেত বিদ্যুৎ সংযোগ? এত বছর আগে এসব প্রযুক্তির গবেষণা ও উদ্ভাবন করে সময়ের চেয়েও এগিয়ে ছিলেন টেসলা।টেসলার ফাইলগুলোর পরিণতি ঠিক কী হয়েছিল আর ফাইলগুলোতেই বা কী ছিল, সবই এখন পর্যন্ত রহস্য হয়ে আছে। এসব নিয়ে কন্সপিরেসি থিওরিরও কোনো কমতি নেই। ২০১৬ সালে ‘ফ্রিডম অফ ইনফরমেশন অ্যাক্ট’ এর অধীনে টেসলার ফাইল সম্পর্কিত ২৫০ পাতার নথিপত্র প্রকাশ করে এফবিআই। পরবর্তীতে মার্চ ২০১৮তে আরও দুটি সংস্করণ প্রকাশ করে সংস্থাটি। কিন্তু তবু, অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর আজও আজও মেলেনি।পাশাপাশি হারানো ফাইলের প্রশ্ন তো আছেই। টেসলার বেশ কিছু ফাইলের হদিশ এখনও পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপক্ষ টেসলার আপন ভাতিজা সাভা কোসানোভিচের সাথে যোগাযোগ করে। তিনি ছিলেন আমেরিকায় কর্মরত তৎকালীন ইয়োগোস্লাভ অ্যাম্বাসেডর। কোসানোভিচ হয়তো টেসলার টেকনোলজি শত্রুপক্ষের হাতে তুলে দিতে পারেন, এই আশঙ্কা থেকে তাকে গ্রেফতার পর্যন্ত করা হয়।১৯৫২ সালে, ইউএস কোর্ট কোসানোভিচকে তার চাচার সকল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করলে টেসলার ফাইল এবং অন্যান্য জিনিসপত্র সার্বিয়ার বেলগ্রেডে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে বেলগ্রেডে নির্মিত নিকোলা টেসলা মিউজিয়ামেই রয়েছে সেসব।  





কিন্তু, এফবিআইয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, টেসলার ডকুমেন্ট বোঝাই ৮০টি ট্রাঙ্ক থাকলেও, বেলগ্রেডে পাঠানো হয়েছিল ৬০টি ট্রাঙ্ক। লক্ষণীয় এ অসংগতির ব্যাপারে এফবিআইয়ের পক্ষ থেকে কোনো রকম বিবৃতি দেয়া হয়নি।ড. ট্রাম্পের রিপোর্ট প্রকাশিত হবার পর, সরকারের পক্ষ থেকে পার্টিকেল ওয়েপন বিমের অস্তিত্ব বারবার উড়িয়ে দেয়া হলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী কয়েক দশকে আমেরিকার সেনাবাহিনী বারবার পার্টিকেল ওয়েপন বিম নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছে। এ ব্যাপারে মার্ক সাইফার বলেন,

“১৯৮৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান ঘোষিত স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভেও ছিল ডেথ রে এর প্রভাব। টেসলার এসব অপ্রকাশিত টেকনোলজি গোপনে সরকারের ব্যবহারই হতে পারে ফাইলগুলো হারানোর সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা।"
ওদিকে টেসলার ডকুমেন্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেই জন ট্রাম্পের ক্যারিয়ারে আসে বড় ধরনের পরিবর্তন।মূলত ড. জন ট্রাম্প বরাবরই ইলেকট্রিক পাওয়ার মেশিনারি ডিজাইনে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু টেসলার মৃত্যুর পর ৬ সপ্তাহ ধরে তার ডকুমেন্ট নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে সেগুলোকে “কাল্পনিক” হিসেবে আখ্যায়িত করে এফবিআইয়ের কাছে রিপোর্ট করার পরেই পাল্টে যায় তার আগ্রহের জায়গা। ইলেকট্রিক পাওয়ার মেশিনারি ডিজাইন ছেড়ে তিনি ভ্যাকুয়ামে সুপার-হাই ভোল্টেজের ইনস্যুলেশন নিয়ে কাজ শুরু করেন।এ প্রসঙ্গে, এমআইটির আর্কাইভ থেকে পাওয়া এক সাক্ষাৎকারে জন বলেছিলেন,
“অবিশ্বাস্য সব আইডিয়া ছিল তার (নিকোলা টেসলা)। বেশ কিছু আইডিয়া আমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও দেখেছি। ছয় সপ্তাহ ধরে পরীক্ষা শেষে বেশ কিছু আইডিয়া আমার যৌক্তিক ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। আর তাই আমি ইলেকট্রিক পাওয়ার মেশিনারি ডিজাইন বাদ দেই। Insulation of High Voltages in Vaccum ও Acceleration of Heavy Particles To High Energies নিয়ে গবেষণা শুরু করি।”



২০১০ সালে ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য ডেইলি মেইলের জন্য পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং তার লেখা একটি আর্টিকেলে ব্যাখ্যা করেন কীভাবে পার্টিকেল এক্সেলারেশনের মাধ্যমে টাইম ট্রাভেল করা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন মানুষকে পাঠানোর মতো যথেষ্ট বড় একটি পার্টিকেল এক্সিলারেটর। আর টেসলার ডকুমেন্টস পরীক্ষা করার পর এই পার্টিকেল এক্সিলারেশন নিয়েই আগ্রহী হয়ে পড়েন জন ট্রাম্প।
মেমোরিয়াল ট্রিবিউট থেকে আরও জানা যায়, সে সময় জন ট্রাম্পের আগ্রহের দুটি জায়গা ছিল 'Insulation of High Voltages in Vacuum' এবং 'Biological Application of High Voltage Radiation'।    


১৯৩৭ সালে আমেরিকান পদার্থবিদ রবার্ট ভ্যান ডি গ্রাফের সাথে কাজ করে জন তৈরি করেন মিলিয়ন ভোল্ট এক্স-রে জেনারেটর। ‘হাই ভোল্টেজ ভ্যান ডি গ্রাফ জেনারেটর’ এর ডিজাইন ও নির্মাণের জন্য যিনি বিখ্যাত। এছাড়াও ‘ভ্যান ডি গ্রাফ পার্টিকেল এক্সিলারেটর’ ছিল তার অনন্য উদ্ভাবন।
টেসলার মৃত্যুর তিন বছর পর, ১৯৪৬ সালে ভ্যান ডি গ্রাফ ও ব্রিটিশ ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ডেনিস রবিনসনকে নিয়ে ‘High Voltage Engineering Corporation’ গড়ে তোলেন ড. ট্রাম্প।কিন্তু, শুধুমাত্র জন ট্রাম্পেই থেমে থাকেনি টেসলা টেকনোলজির অগ্রযাত্রা। ধারণা করা হয়, জনের মাধ্যমে ট্রাম্প পরিবারের হাতে পড়া টেসলা টেকনোলজি জানার ও শেখার সৌভাগ্য হয়েছিল খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও। নিজের ব্যাপারে তিনি বলেন,

“আমার আঙ্কেল ছিলেন এমআইটির গ্রেট একজন প্রফেসর। যত দূর মনে পড়ে, প্রায় চার দশক সেখানে কাজ করেছেন তিনি। আর তার সাথে আমার সবসময়ই নিউক্লিয়ার নিয়ে কথা হতো।”

তিনি বর্তমানে তাঁর বিভিন্ন টুইট ও বক্তৃতার জন্য আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন।(xD)
এছাড়াও চাচার চেয়ে তিনিও যে মেধায় কোনো অংশে থেকে কম না, বিভিন্ন সময়ে মিডিয়ার সামনে তা তা তুলে ধরার চেষ্টাও করেছেন তিনি(xD)।
 
ট্রাম্প বলেন,“আমার একজন আঙ্কেল ছিলেন আর আমি হর্স থিউরিতে বিশ্বাস করি।আর যাইহোক কখনো তো দূর্বল ঘোড়া থেকে তেজী ঘোড়া আসে না”





তিনি আরও বলেন,
“আমি আসলেই নিউক্লিয়ার বুঝি। বিশ্বাস না হলে এমআইটির ড. জন ট্রাম্পের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখুন। বহু বছর তিনি এমআইটিতে কাজ করেছেন। নিউক্লিয়ার নিয়েই তার সাথে কথা হতো আমার।”






একটু ভিন্ন ধারা থেকে এখন ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি আসুন। ট্রাম্প পরিবারের সাথে টেসলার রয়েছে অদ্ভুত সংযোগ নিয়ে মানুষের আগ্রহের কোনো কমতি ছিল না কখনোই। পার্টিকেল এক্সেলারেটরের কারণে টাইম ট্রাভেল বিষয়ক টেসলার গবেষণার ব্যাপারটা নিয়ে তো আলোচনা ছিল সবসময়ই। কিন্তু, সম্প্রতি কল্পনার আকাশে বিস্ময় যেন আবারও মেলেছে ডানা। ১২৭ বছরের পুরনো এক বই নতুন করে তুলেছে আলোড়ন।বইটির নাম “1900 Or, The Last President”! ১৮৯৬ সালে, আমেরিকান লেখক ইনগার্সল লকউডের লেখা বইটিতে, গল্পের শুরুই হয়, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট ইলেকশন দিয়ে। ইলেকশনে সবাই ট্রাম্পের জয় অসম্ভব ধরে নিলেও শেষ পর্যন্ত জয়ী হন ট্রাম্প। বইয়ে উল্লেখিত ট্রাম্পের হোটেলটি অবস্থিত ছিল ফিফথ এভিনিউতে। এছাড়াও, তার প্রশাসনে সেক্রেটারি এগ্রিকালচার পদে ছিলেন “লেফ পেন্স” নামের এক ব্যক্তি।ইনগার্সলের গল্পের সাথে এবার একটু আমাদের বাস্তবতা মিলিয়ে দেখা যাক। গল্পের ট্রাম্পের মতনই ২০১৬ সালে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে অংশ নিলেন, কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে এই খ্যাপাটে মানুষটি ইলেকশনে জিততে পারবে।অথচ সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, ঠিকই শেষপর্যন্ত ইলেকশন জিতে ট্রাম্প হয়ে গেলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট। তার ট্রাম্প টাওয়ার কোথায় অবস্থিত জানেন? ফিফথ এভিনিউ! ইনগার্সলের গল্পে ট্রাম্প হোটেলটিও কিন্তু ছিল ঠিক এখানেই। আরও অবাক করা ব্যাপার হলো, গল্পের লেফ পেন্সের মতোই একজন বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনে আছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট, মাইক পেন্স।২০০৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘর আলো করে জন্ম নেয়া তৃতীয় পুত্র সন্তানের নাম রাখা হয়েছিল ব্যারন ট্রাম্প! আর ২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ায় “1900 Or, The Last President” এর সাথে অবিশ্বাস্য মিল খুঁজে পাবার পরেই মূলত ব্যারন ট্রাম্পের দিকে নজর পড়ে বিশ্ববাসীর! কারণ ইনগার্সলের লেখা আরও কিছু বইয়ের একটি প্রধান চরিত্র অবিশ্বাস্য ভাবে মিলে যায় এই ব্যারন ট্রাম্পের সাথে।  






ডোনাল্ড ট্রাম্প-পুত্র ব্যারনের জন্মেরও বহু বছর পূর্বে, ১৮৯৩ সালে ইনগার্সল “Baron Trump’s Marvelous Underground” নামের একটি শিশুতোষ উপন্যাস লেখেন, যা বর্তমানে হয়ে উঠেছে ভবিষ্যতবাণীর চরম নিদর্শন।
বইটির মূল কাহিনী গড়ে উঠেছে ব্যারন ট্রাম্প নামের এক ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে। যে সবসময় তার গুরু “ডন” এর নির্দেশনা মেনে চলতো। ডনের ম্যানুস্ক্রিপ্ট অনুযায়ী, ব্যারন ট্রাম্প উত্তর রাশিয়ার একটি অঞ্চল থেকে খুঁজে পায় টাইম ট্রাভেল পোর্টাল, যাকে বইয়ে “world within a world” বলে উল্লেখ করা হয়েছে!
ধারণা করা হয় অঞ্চলটি আপার ইউরালের ওয়েস্টার্ন স্লোপ। রাশিয়ার এ অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য পাহাড়-পর্বত এবং অনাবিষ্কৃত গুহা ও সুরঙ্গ। কিন্তু রাশিয়ার এমন দুর্গম অঞ্চলে কাজ করা একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের পক্ষে কি আসলেই সম্ভব?বাস্তবে আমেরিকা রাশিয়া সম্পর্কে প্রায় সবসময়ই টানটান উত্তেজনা বিরাজ করলেও, ২০১৬ সালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের কথা কম-বেশি প্রায় সকলেরই জানা। আর তাই ট্রাম্পের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক থাকা কিন্তু মোটেই অসম্ভব না।ইনগার্সলের গল্পের সবকিছুই ছিল সময়ের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে।এ বইয়ের ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী, ট্রাম্পই সম্ভবত হতে চলেছেন আমেরিকার শেষ প্রেসিডেন্ট। দ্য লাস্ট প্রেসিডেন্ট বইয়ে বলা হয়, ট্রাম্প জয়ী হবার পর দেশব্যাপী চরম বিদ্রোহের মুখে পড়লেও একটা পর্যায়ে দেশকে ঋণমুক্ত করে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক মন্দা দূর করবেন।ভবিষ্যৎবাণী মিলে যেতেই পারে কিংবা হতে পারে কাকতালীয়! কিন্তু ইনগার্সলের লেখা বইগুলোতে উঠে আসা এসব “তথ্য” কি আদৌ কাকতাল ছিল? নাকি সত্যিই কোনো টাইম ট্রাভেলারের দেখা পেয়েছিলেন ইনগার্সল। হতে পারে সেই টাইম ট্রাভেলারটি ছিল আমাদের চিরচেনা এই ডোনাল্ড ট্রাম্প-পুত্র!


শুধু ব্যারন ট্রাম্পকে নিয়েই চার চারটি বই লিখেছিলেন ইনগার্সল। সত্যিই কি অতীত ভ্রমণ করে এসেছে ব্যারন ট্রাম্প? আর অতীত ভ্রমণের কোনো একপর্যায়ে সে মুখোমুখি হয়েছিল ইনগার্সলের?১৮৪১ সালে নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণ করা ইনগার্সল লকউড পেশায় আইনজীবী হলেও ক্যারিয়ারের শুরুটা তার হয়েছিল ডিপ্লোম্যাট হিসেবে। ১৯৬২ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাকে কিংডম অফ হ্যানওভারের কনসালে নিযুক্ত করেন।চার বছর পর নিউ ইয়র্কে ফিরে বড় ভাই হেনরির সাথে লিগ্যাল প্র্যাকটিস শুরু করেন ইনগার্সল। ১৮৮০ সালে তিনি প্রভাষক এবং অধ্যাপক হিসেবে নতুন ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন। শিশুতোষ উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন বেশ কিছু নন-ফিকশন। আরউইন লংম্যান ছদ্মনামেও লিখতেন তিনি।মূলত ২০১৬ সালের আমেরিকান প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনে অবিশ্বাস্যভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতে গেলে, পরের বছর জুলাইতে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে “1900 Or The Last President” বইটির কিছু স্থিরচিত্র। আর তারপরই প্রথমবারের মতো রাতারাতি বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন এই রহস্যময় লেখক। অনুসন্ধিৎসু মানুষজনের প্রচেষ্টায় একের পর এক চমকে বিস্ময়ের ঘোর কাটার সুযোগ পাবার আগেই দুনিয়াবাসী খুঁজে পেল ইনগার্সল লকউডের আরও কিছু প্রকাশনা।

 বইগুলোর দেয়া তথ্য কিংবা ভবিষ্যতবাণী নিয়ে চিন্তা করলে টাইম ট্রাভেলের মাধ্যমে কোনো অতীত ভ্রমণকারীর সাথে ইনগার্সলের দেখা হওয়াকেই সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা মনে হয়!কিন্তু সত্যিই যদি ব্যারন ট্রাম্প টাইম ট্রাভেল করেও থাকে, সেই প্রযুক্তি সে কোথায় পেল? ইনগার্সলের বইতে, ব্যারন টাইম ট্রাভেল করতে পেরেছিল তার ডন নামক কোনো ব্যক্তির ম্যানুস্ক্রিপ্ট অনুসরণ করে। আর আমরা ইতিমধ্যেই জানি যে, তার পার্টিকেল এক্সেলারেটর নিয়ে কাজ করা আংকেল জনের কাছ থেকে নিকোলা টেসলার ম্যানুস্ক্রিপ্ট পাওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে খুবই সম্ভব।২০১৬ সালে ১৯ জুলাই, নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় সাউথ ক্যারোলিনার এক অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “নিউক্লিয়ার যে কতটা শক্তিশালী তা আমার আঙ্কেল বহু বছর আগেই আমাকে বলেছিলেন। ৩৫ বছর আগেই তিনি আমাকে শক্তির ভবিষ্যৎ বলে দিয়েছিলেন। কে ভেবেছিল যে, সেটাই সত্যি হবে!”সত্যিই যদি জন তাকে শক্তির ভবিষ্যৎ বলে গিয়ে থাকেন, টেসলার গবেষণালব্ধ জ্ঞান আর কী কী সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে ট্রাম্প পরিবারের সামনে তা হয়তো আমাদের কল্পনারও বাইরে।  

প্রেসিডেন্ট হবার পর ট্রাম্পের বলা সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো “ওয়াল” নির্মাণ করা। অবৈধ অভিবাসন, মানব পাচার, চোরাচালান বন্ধ করা সহ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা জোরদার করতেই ট্রাম্পের এমন বক্তব্য। কোনো দেশের সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করার মতো অদ্ভুতুড়ে কথাকে পাগলামো হয়তো মনে হতেই পারে। কিন্তু সত্যিই কি তা নির্মাণ সম্ভব?
জীবদ্দশায় নিকোলা টেসলা পার্টিকেল বিম ওয়েপনের পাশাপাশি বলেছিলেন “ইলেক্ট্রো-স্ট্যাটিক এনার্জি ওয়াল” এর কথা, যা ব্যবহার করে একটি দেশকে যে কোনো বহিরাগত আক্রমণ থেকেও রক্ষা করা সম্ভব। যারা মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের ব্ল্যাক প্যান্থার খ্যাত আফ্রিকার গোপন কাল্পনিক রাষ্ট্র ওয়াকান্ডার সাথে পরিচিত, তারা হয়তো এ দেয়ালের কার্যকারিতা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে পারেন সহজেই। এছাড়াও, পার্টিকেল বিম ওয়েপন বা ডেথ রে দিয়ে আকাশ পথে যেকোনো ধরনের আক্রমণকেও প্রতিহত করা সম্ভব, এমনটাই বিশ্বাস করতেন টেসলা!


ড. জন ট্রাম্পের ল্যাব ডিরেক্টর জেমস মেলচার একবার বলেছিলেন,
“তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে, জনের শরণাপন্ন হয়েছে প্রায় সব ধরনের মানুষ। কারণ ও চাইলেই আয়ন আর ইলেকট্রনের মেগাভোল্ট থেকে ডেথ রে তৈরি করতে পারতো। … ভাবছেন, তা দিয়ে কী করতো? ক্যান্সার রিসার্চ করতো, ডিয়ার আইল্যান্ডে বর্জ্য পদার্থ স্টেরিলাইজ করতো, করতো অদ্ভুত সব কাজ।”


শতাব্দীর সেরা বিজ্ঞানীর গবেষণালব্ধ জ্ঞানশিখার দ্যুতি কি আর এত সহজে যায় লুকোনো? মেলচারের বক্তব্য সত্য হলে, ডেথ রে নিয়ে কাজ করে গেছেন ড. ট্রাম্প। ব্যবহার করেছেন ক্যান্সারের নিরাময় খুঁজতে। ক্যান্সার রিসার্চ কী এবং কেন প্রয়োজন তা তো সকলেই জানেন। আর জেমস মেলচারের উল্লেখ করা এই ডিয়ার আইল্যান্ডের অবস্থান বোস্টনের ম্যাসাচুসেটসে। ১৮৫ একরের এই আইল্যান্ডের দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চলজুড়েই আছে দূষিত পানি পরিশোধনাগার। শিল্প-বর্জ্য শোধনাগার হিসেবেই ডিয়ার আইল্যান্ড পরিচিত।উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে শিল্প-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খুবই জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।  



   ডিয়ার আইল্যান্ড, ম্যাসাচুসেটস, বোস্টন


আপনি যখন এই আর্টিকেলটি পড়ছেন, আমেরিকায় তখন প্রতি টন বর্জ্য পরিশোধনে খরচ হচ্ছে ৫০.৬০ ডলার। প্রতি বছর আমেরিকাতে প্রায় ২৩০ মিলিয়ন টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপযোগী হয়। লক্ষ লক্ষ ডলারের গবেষণা হচ্ছে, কীভাবে আরও পরিবেশবান্ধব উপায়ে এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যায়। আর এসব গবেষণা হচ্ছে বেশ কয়েক শতক ধরেই। তেমনই রিসার্চে অংশ নিয়েছিলেন জন জি. ট্রাম্প।টেসলার প্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি শুধু ট্রাম্পের পক্ষেই এত কিছু করা সম্ভব হয়ে থাকে, তাহলে স্বয়ং টেসলার জীবদ্দশায় ডেথ রে সহ বাকি প্রকল্পগুলো সরকারী অনুমোদন পেলে দুনিয়াবাসীর সামনে বিজ্ঞানের আর কী কী বিস্ময় উন্মোচিত হতো, তা কল্পনা করার শক্তি বা সামর্থ্যটুকুও হয়তো আমাদের নেই। আবার এমনও হতে পারে যে, টেসলার গোপন নথিপত্র যদি সত্যিই চুরি হয়ে থাকে। কোনো না কোনো একসময় দুনিয়ার কোনো প্রান্তে সেসব গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে বাস্তবতায় রূপ দিয়ে কেউ এনে দেবে পূর্ণতা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হবে আরও সমৃদ্ধ।গতকালকে  অর্থাৎ সর্বশেষ সিএনএন এর একটি খবর আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।আমি স্ক্রিনশট তুলে রেখেছিলাম সেটাই দিতে পারছি।সত্যতার জন্য কষ্ট করে নেট ঘেটে দেখবেন।ব্যাপারটা কোনদিকে এগিয়ে যাচ্ছে এখন হয়তো বুঝতে পারছেন কি????  







এছাড়াও, প্রফেসর ট্রাম্প এমআইটিতে ‘ভ্যান ডি গ্রাফ জেনারেটর’ এর ওপর বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। আর এই জেনারেটরই ছিল নাৎসি বাহিনীর ডিজাইন করা ফ্লাইং সসারের অন্যতম প্রধান অংশ। ১৯৪৭ সালে রসওয়েলে ফ্লাইং সসার ক্র্যাশ হওয়া আমেরিকার একটি সুপরিচিত ঘটনা।  



আমেরিকার রসওয়েলে “ফ্লাইং সসার ক্র্যাশ” খবরের পেপার কাটিং    

এফবিআই প্রকাশিত নথিপত্র থেকে এ ঘটনার সাথেও প্রফেসর ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়া যায়। ফ্লাইং সসার, যা কি না ছিল টেসলার গবেষণা বস্তুগুলোর একটি।জীবদ্দশায় টেসলার গবেষণার অন্যতম একটি ক্ষেত্র ছিল তারবিহীন কণা ও শক্তি সঞ্চালনা। আর এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই হয়তো তিনি টেসলাস্কোপ ডিজাইন করেছিলেন। টেসলাস্কোপ নামটির প্রবর্তন হয় নিকোলা টেসলার মৃত্যুর পর। এটি ছিল এক বিশেষ ম্যাগনিফাইং রিসিভার যা দিয়ে বিশেষ মাধ্যমে শক্তি সঞ্চালন করা যেত। আর ধারণা করা হয়, গোপন এ ডিভাইস তৈরি করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে শক্তি সঞ্চালন করা কিংবা মহাজাগতিক প্রাণীদের সাথে যোগাযোগ করা। অবিশ্বাস্য মেধার সেই মানুষটি বিজ্ঞানের আর কোন কোন রহস্য নিয়ে খেলা করে গেছেন সেটাই হয়তো সবচেয়ে বড় রহস্য। কারণ, আজও টাইম ট্রাভেল, মহাজাগতিক প্রাণী, পার্টিকেল ওয়েপন বিম বা ডেথ রে এ সবই আমাদের কাছে সায়েন্স ফিকশন।কিন্তু, আসলেই কি এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই? তা সময়ই বলে দেবে। হয়তো ইনগার্সলের ভবিষ্যৎবাণী ও শতাব্দী সেরা বিজ্ঞানী টেসলার সাথে ট্রাম্প পরিবারের এসব সম্পৃক্ততা নিছক কাকতালীয় ব্যাপার। কিংবা সময়ের সাথে হয়তো একে একে মিলতে থাকবে ইনগার্সলের সকল ভবিষ্যদ্বাণী। আর ভবিষ্যৎ অবলম্বনে তার রচিত বইগুলোই হয়ে উঠবে আমাদের ভাগ্যলিপি।

একটি ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রায় ১২৭,০০০ ডলার সংগ্রহ করে ২০১৩ সালের মে মাসে টেসলার ৭ ফুট উঁচু একটা মূর্তি বানানো হয়। কিন্তু কয়েক মাস পরেই ডিসেম্বরে মূর্তিটি টাইম ক্যাপসুলের মাধ্যমে ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং সেখানে ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন বানানো হয়। অনেকে এ ঘটনাকে মজা করে বলে থাকে যে, টেসলা থেকে তাহলে আমাদের ওয়াই-ফাই জোনেরও ব্যবস্থা হয়ে গেলো।

এখন একটা প্রশ্ন উঠে যে এতই যখন তিনি অবদান রাখলেন তাহলে আমরা কেনো তাঁর ব্যাপারে জানি না।প্রশ্নটা যৌক্তিক।উত্তরটা হচ্ছে আমরা জানি না তা না আসলে আমাদের জানানো হয় না।আমরা বইতে নিউটন,আইন্সটাইন কে চিনলেও টেসলাকে চিনি না কারণ আমাদেরকে তাঁর ব্যাপারে তেমন জানানো হয় না।আর না জানানোর মূল কারণ তাঁর সৃষ্টিশীল অবদানগুলো যার এখনো অনেক কিছুই বড় বড় দেশগুলো চেষ্টা করছে থিউরী থেকে তা বাস্তবে রূপ দেয়ার।স্বভাবতই আপনি চাইবেন না আপনার আবিষ্কার অন্য কেউ পেটেন্ট নিক এজন্য ইউএস সরকার এই ব্যাপারে খুব সতর্কতা অবলম্বন করে আসছে।আমিও জানতাম না যদি না নেট ঘাটাঘাটি না শুরু করতাম...

টেসলা ছিলেন মানবতার সেবায় নিবেদিতপ্রাণ এক মহতী আত্মা। তার একমাত্র প্রচেষ্টা ছিলো প্রকৃতির নিগুঢ়তম রহস্য আবিষ্কার করে মানুষের জীবনকে সহজতর করা। কোনো ব্যবসায়িক লক্ষ্য নিয়ে তিনি কখনো চালিত হন নি। সম্প্রতি আমেরিকান মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA মহাকাশে একটি পরীক্ষা মূলক রোবট চালিত যান পাঠিয়েছে যার নাম রাখা হয়েছে ‘টেস্‌লা কার’। এছাড়া এলন মাস্কের কথা আমরা সবাই জানি।তিনিও টেসলা বিদ্যুতকে ব্যবহার করে নতুন সব প্রযুক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে আমাদের। অপেক্ষাকৃত সহজ ব্যবহার্য বস্তুতে পরিণত করে তিনি এক জাদুকরী পরিবর্তনের সূচনা করেন। বিস্ময়কর কল্পনাশক্তি আর অমূল্য মেধার দ্বারা যুগ যুগ ধরে কল্পনাপ্রবণ ও আত্মত্যাগী মানুষদের অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন নিকোলা টেসলা।



"It is paradoxical, yet true, to say, that the more we know, the more ignorant we become in the absolute sense, for it is only through enlightenment that we become conscious of our limitations." -Nikola Tesla  





+লেখক: জুনায়েদ ইসলাম
দ্বাদশ শ্রেণী, এস ও এস হারম্যান মেইনার কলেজ কলেজে পড়ার পাশাপাশি, বই পড়তে ও মুভি দেখতে ভালোবাসেন। তবে ডিটেকটিভ সবকিছু খুব বেশি প্রিয়, নতুন কিছু জানতে এবং জানাতে তিনি সর্বদাই আগ্রহী।

লেখকের লিংক:আইডি লিংক