ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

যুদ্ধ যখন জীবাণু নিয়ে - লিখেছেন - মৃন্ময় নন্দী বাপ্পা

 

পটভূমিটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। হিটলারের নির্দেশে নাৎসি বাহিনী ব্যাপক হারে ইহুদী হত্যা করে চলেছে। হলোকাস্ট থেকে বাঁচতে পারছে না কোনো ইহুদীই, এমনকি শিশু-বৃদ্ধরাও না। অন্যদিকে মিত্রশক্তিও থেমে নেই। তারাও অভিনব কৌশল অবলম্বনের চেষ্টা করছে, জৈব অস্ত্র!
হ্যাঁ, তারা অ্যানথ্রাক্স, ব্রুসেলোসিয়া ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে দেয়ার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল। সৌভাগ্যবশত এই অস্ত্র ব্যবহারের আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়, নইলে আমাদের আরও ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে হোত।
জৈব অস্ত্র-সস্ত্রের ব্যবহার কিন্তু এই নতুন নয়, বরং অনেক প্রাচীন। প্রায় ২.৫ হাজার বছর পূর্বে অসিরীয়রা শত্রুদের বিরুদ্ধে 'রাই এরগট' ছত্রাক ব্যবহার করেছিল বলে জানা যায়। তারা শত্রুদের পানির কূপে এই ছত্রাক মিশিয়ে দিয়েছিল। এই ছত্রাক LSD সংক্রান্ত রাসায়নিক ধারণ করে, যা শত্রুদের মধ্যে হ্যালোসিনেশন এমনকি মৃত্যুও ঘটায়।
কি? আরও শুনতে চাও? জৈব অস্ত্রের এমন আরও অনেক উদাহরণ আছে ইতিহাসের পাতায়। চলো তাহলে প্রথমে সেগুলোই জেনে আসি।

অ্যানথ্রাক্স

বিশেষজ্ঞদের মতে এটা সবচেয়ে সুবিধাজনক অস্ত্র। কারণ এ জীবাণু প্রকৃতিতে সহজেই পাওয়া যায় আবার ল্যাবরেটরিতেও সহজেই উৎপাদন করা যায়। Bacillus anthracis ব্যাকটেরিয়ার আক্রমনে এ রোগ হয়।

২০০১ সালে এ ব্যাকটেরিয়া আমেরিকায় ডাক সেবার মাধ্যমে পাঠানো হয়। প্রায় ২২জন আক্রান্ত হয়, যার ৫জন মারাও যায়। তবে অপরাধীচক্র ধরা পড়েনি। এ প্রচেষ্টাটি Operation Cherry Blossoms at Night নামে পরিচিত।

প্লেগ

Yersinia pestis ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এ রোগ হয়। মাছির কামড়ের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। এর সংক্রমনে বিউবনিক প্লেগ হয়ে লিম্ফগুলো ব্লক হয়ে যায়। হঠাৎ করে জ্বর দেখা দেয়, রোগী দুর্বল বোধ করে। ফুসফুস পর্যন্ত সংক্রমণ পৌঁছালে তা নিউমোনিক প্লেগে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপান এয়ার ফোর্স মাছি ভর্তি সিরামিক বোমা নিক্ষেপ করে নিংবো ও চীনের ওপর!

কলেরা

কলেরা জৈব অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত। পাকস্থলী ও অন্ত্রে এর সংক্রমণ ঘটে থাকে। এটি খুব সহজেই মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। শুধু পানির উৎসের সাথে পর্যাপ্ত পরিমানে এর জীবাণুর সংমিশ্রণ ঘটানোর অপেক্ষা।

Vibrio cholerae ব্যাকটেরিয়ার আক্রমনে এ রোগ হয়, যার প্রধান উপসর্গ উদরাময়, পেটব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা ইত্যাদি। উপযুক্ত চিকিৎসা না পেলে শেষ পর্যন্ত রোগীর ডিহাইড্রেশনে মৃত্যু ঘটে। সংক্রমনের প্রধান বাহক হলো পানি ও খাবার। আমেরিকা, জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরাকের এই ব্যাকটেরিয়া হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের নজির রয়েছে।





এছাড়াও আরও অনেক উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে জৈব অস্ত্রের।

- ১৭৬৩ সালে ব্রিটিশ সেনা আমেরিকানদের বিরুদ্ধে গুটি বসন্তের জীবাণু ব্যবহার করেছিল।

- ১৯৮০-৮১ সাল পর্যন্ত কিউবাতে ডেঙ্গু জ্বরে কয়েক লাখ মানুষ মারা যায় এবং ফিদেল কাস্ত্রো অভিযোগ করেছিলেন, এর প্রাদুর্ভাব ঘটে
যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা।

- এমন অভিযোগও শোনা যায়, পেন্টাগন(মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জীবাণু অস্ত্র নিয়ে গবেষণার জন্য অনুদান দিয়ে থাকে।এরকম আরও অনেক উদাহরণ মিলবে ইতিহাসের আনাচে কানাচে।

৩ প্রকার

সকল জীবাণু অস্ত্রের ক্ষমতা সমান হয়না। কোনোটার বেশি,কোনোটার কম। ক্ষমতা অনুযায়ী পরিস্থিতি বিশেষে এদের নির্বাচন করা হয়। এদের প্রধানত ৩ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো একটু জেনে আসা যাক:

(১) ক্যাটাগরি A:

এরা বিপুল ক্ষয়ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপরও যথেষ্ট বিরূপ প্রভাব ফেলে।এরা খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে।অ্যানথ্রাক্স, গুটিবসন্ত, প্লেগ ইত্যাদি এই ক্যাটাগরির আওতায় পরে।

(২) ক্যাটাগরি B:




এদের বিস্তার,ক্ষয়ক্ষতির ক্ষমতা ক্যাটাগরি A এর তুলনায় কম। Melioidosis,Q fever,Brucellosis ইত্যাদি এই ক্যাটাগরিতে পড়ে।

(৩) ক্যাটাগরি C:

এ ক্যাটাগরির জীবাণু সহজেই ল্যাবরেটরিতে তৈরী করা যায়। তবে সংক্রমনের হার ও বিস্তারের ক্ষমতা এদেরও কম নয়। Multidrug Resistant Tuberculosis(MRT) এর একটি উদাহরণ।

কিন্তু এগুলো আসে কোত্থেকে?

সব তো বুঝলাম। কিন্তু এত জীবাণু আসে কোথা থেকে? এসব অনুজীব উৎপাদন, প্রসার তো আর চাট্টিখানি কথা না!

এসব জীবাণু যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট গবেষণার প্রয়োজন হয়। কোন জীবাণু কোন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে, কিভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে, নিজেদের কিভাবে রক্ষা করা যাবে এসবের জন্য গবেষকদের প্রচুর কাঠ-খড় পোড়াতে হয়। অনেকক্ষেত্রে জেনেটিক পরিবর্তনও আনা হয় জীবাণুর। গুপ্ত গবেষণাগার স্থাপন করে অনেক রাষ্ট্র। দেশগুলো যথেষ্ট অর্থও খরচ করে এসবের পেছনে।
তবে এ জীবাণু ছড়িয়ে দিতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সৃজনশীলতার নজির রয়েছে।
আগেই বলেছি, অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ডাকসেবা ব্যবহার করা হয়েছিল। খামের মধ্যে ছিল সাদা পাউডার, যার সাথেই মিশে ছিল প্রাণঘাতী অ্যানথ্রাক্স জীবাণু। অ্যারোসলের মাধ্যমে জীবাণু ছড়ানোর নজিরও রয়েছে। বিষ্ফোরণ হচ্ছে আরেকটি সম্ভাব্য পদ্ধতি। বোমার ভেতরে জীবাণু মজুত থাকে যা বিষ্ফোরণের মাধ্যমে মুক্তি পায় ও ছড়িয়ে পড়ে। বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য উপযুক্ত জীবাণু খাবার ও পানির সাথে সংমিশ্রণ করা হয়। এতে একটি বড় এলাকা আক্রান্ত হতে পারে।






পরিণাম

এত সবকিছু জানার পর নিশ্চই আন্দাজ করতে পারছ, জৈব যুদ্ধবিগ্রহের প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে। চলো তবে সে ব্যাপারেই একটু আলোকপাত করা যাক।

DNA মিউটেট করে এ জীবাণুগুলো পরিবর্তন করতে পারে রোগের ধরণ। তাই রোগের লক্ষণ, প্রতিকার সবই পরিবর্তন হতে পারে।তখন রোগটির চিকিৎসা করা আরও কঠিন হয়ে যায়। ফলে রোগটির উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি সন্ধানের আগেই তা অনেক বড় মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে এবং মূল্য দিতে হয় অনেক প্রানের।
তাছাড়া অনেকক্ষেত্রেই জীবাণু প্রকৃতিতে অনেককাল টিকে থাকতে পারে। যেমন:অ্যানথ্রাক্স মাটিতে ৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।
এছাড়াও, নতুন প্রজন্মেও এর বিরাট প্রভাব পরতে পারে। জীবানুর এই জেনেটিক মিউটেশন সদ্য জন্মা নেয়া শিশুর অপরিপক্বতা, বিকলাঙ্গতাসহ নানা প্রকার জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।
অনেকসময় জীবাণু মিউটেট করে মানুষ ছাড়িয়ে অন্যান্য প্রজাতির মধ্যেও ছড়িয়ে পরে। ফলে গাছপালা, জীবজন্তুও ক্ষয়ক্ষতির আওতায় এসে পড়ে যা প্রকৃতির ভারসাম্য প্রচন্ডভাবে নাড়িয়ে দেয়।তাছাড়া পরোক্ষ প্রভাব তো আছেই।
যেমন, এত মানুষের অসুস্থতা-মৃত্যু অর্থনীতিতেও বড় ধস বয়ে আনে। প্রত্যক্ষভাবে জীবাণুর কারণেই হোক বা পরোক্ষভাবে রোগের ভীতিই হোক, তার দ্বারা কৃষিও প্রভাবিত হতে পারে। কৃষি প্রভাবিত হলে অনেকক্ষেত্রেই তা দূর্ভিক্ষ ডেকে আনতে পারে। এত মৃত্যু কত যে শিশুকে অনাথ করে, কত বাবা-মায়ের কোল থেকে সন্তান কেড়ে নেয়, তার হিসাব নেই। আবার এধরনের পরিস্থিতি মানুষের মনের মধ্যে যে ছাপ ফেলে তাও ফেলে দেয়ার মত নয়।

এ ত্রাস বন্ধের উদ্দেশ্যে ১৯৭২ সালে বেশকিছু দেশ "Biological and Toxic Weapons Convention" এ স্বাক্ষর করে, যা এ ধরনের জীবানু যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে কাজ করে। ১৯৯৬ সালের মধ্যে ১৩৭টি দেশ এ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কোথাও জৈব অস্ত্রের উৎপাদন হচ্ছে কিনা, হলে কিভাবে তা আটাকানো যায়, সর্বোপরি কিভাবে মানবজাতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে কাজ করা হয়।
এত প্রচেষ্টা সব ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমরা নিজেদের বিবেচনাবোধ জাগিয়ে না তুলি। যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে যে আমরা নিজেদের অস্তিত্বই সন্দেহের মুখে ঠেলে দিই। আমাদের কর্তব্য জৈব যুদ্ধসহ সকল প্রকার যুদ্ধ থেকে বিরত হওয়া।
পরিশেষে,"বাঁচো এবং বাঁচতে দাও"।




সূত্র:
Ukessays,
Medical News Today,
Wikipedia

মৃন্ময় নন্দী বাপ্পা
পড়ছেন বুয়েটে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। জীবনের অর্থের খোঁজে চলেছেন অজানায়..