ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

দিন যেখানে যায় হারিয়ে - লিখেছেন - পদাতিক চৌধুরী



গতকাল সন্ধ্যাবেলা দোকান থেকে শেষ মুহূর্তে কিছু কেনাকাটা করে বাড়ি ফেরার পথে শ্রীমানের উদ্দেশ্যে আমার ছোট্ট প্রশ্ন ছিল,

- বাবা এবার ঈদে তোমার তাহলে কতগুলি শার্ট-প্যান্ট হয়েছে?

- আহা! পাপাটা না! আমার ওসব জামা-কাপড়ের কথা শুনতে ভালো লাগছে না।

- হ্যাঁ ঠিকই তো! তোমার ওসব জামাকাপড়ের কথা শুনতে ভালো না লাগারই কথা। আমার যতদূর মনে পড়ছে তোমার তিনটি প্যান্ট,দুটি-শার্ট, দুটি টি-শার্ট ও একটি পাজামা-পাঞ্জাবি হয়েছে।

- পাপাটা না! সব জেনে আবার প্রশ্ন করে।

- আজ তুমি বিরক্ত হচ্ছো? অথচ তুমি জানলে অবাক হবে যে তোমার মত বয়সে আমরা জামাকাপড় পেতাম না। কিন্তু পেতাম অনেক কিছু।

- কি পেতে তোমরা?

-শুনবে তুমি সে কথা? বেশ! তুমি তো জানো পরিবারের সদস্য পিছু একটি করে ফিতরা দিতে হয়। সেটা দেড় কেজি গমের মূল্য মানের সমান। এবছর যার মান দাঁড়িয়েছে ৭০ টাকা। আমরা ভাই-বোন মিলে সাতজন ছিলাম। প্রত্যেক বছর ঈদুল ফিতরের সকালে তোমার দাদুভাই আমাদের সব ভাইবোনদের একত্রে ডাকতেন। বড় ভাইবোনদের অনুসরণে আমরা গোল করে বসতাম। তোমার দাদুভাই পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বার করে আমাদের কোন একজনের হাতে ধরিয়ে দিতেন। সে পাশের জনকে দিত। পাশের জন্য আবার তার পাশের জনকে দিত। এইভাবে হাত ঘুরে টাকাটা আবার দাদুভায়ের হাতে চলে যেত। দাদুভাই এর পরে টাকাটা দাদীমার হাতে দিতেন। দাদীমা টাকাটা হাতে নিয়ে আবার দাদুভায়ের হাতে ফেরত দিতেন। আর তখনই টাকাটা ফেতরার উপযোগী হয়ে উঠত বলে জানতাম। ক্রমশ বড় হয়ে দাদুভাইয়ের এই হাতবদল ফিতরার পদ্ধতিটি কতটা শরীয়ত সম্মত সে প্রশ্ন মনে জাগলেও মুখ ফুটে বলার সাহস পেতাম না- নিজেদের আর্থিক দৈন্যদশার উপলব্ধির করে। আজ আমি অবশ্য তোমার দাদুভাইয়ের পদ্ধতিতে ফিতরা দেই না। তুমি হয়তো লক্ষ্য করে থাকবে আমার, তোমার ও তোমার মায়ের তিনটি ফেতরা আমি ইতিমধ্যে তিনজন গরিব মানুষকে দান করেছি।

ঈদের সকালটা অন্য এক দিক দিয়েও কাছে খুব উপভোগ্য ছিল। সেদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা পার্শ্ববর্তী পুকুরে জমা হতাম। আশপাশের বাড়িগুলি থেকে সবাই চলে আসতো পুকুরে গোসল করতে। যারা পেশাগত কারণে দূর-দূরান্তে থাকে তারাও ইতিমধ্যে বাড়ি এসে পুকুর পাড়ে চলে আসতো। চারদিকে ছোট-বড় মিলিয়ে হই হট্টগোল বা কোলাহলের মধ্য দিয়ে গোসল করাকালীন আমাদের নতুন জামা-কাপড় না পাওয়ার ব্যথা ভুলে যেতাম। বিভিন্ন রকম সেন্টেড সাবানের গন্ধে বাতাস ভরে যেত।
গোসল করে বাড়ি এসে তোমার দাদুভাই ও দাদীমার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতাম। আমাদের ছোট ভাই-বোনদের দাদীমা এক টাকা করে ঈদের হাত খরচ দিতেন। ময়দান থেকে ফেরার পথে পাপড় ও পিয়াজি কিনে খেতাম। টাকাটা ছিল তোমার দাদীমায়ের হাস-মুরগির ডিম বিক্রি করা টাকা। অনেক পরে টাকাটা বৃদ্ধি পেয়ে দুই টাকা হয়েছিল। ঈদের দিনে দুই টাকা পেলে তার মধ্যে একটি আইসক্রীম খাওয়ার নিশ্চিত সুযোগের অপেক্ষায় আমি আগে থেকে পুলকিত হতাম। সাদা চিড়ে ও রঙিন কাঠি আইসক্রিম তখন ফেরিওয়ালারা হেকে হেকে বিক্রি করতো।

- পাপা তুমিও আমার মত আইসক্রিম খেতে পছন্দ করতে?

- হ্যাঁ বাবা আমি তো তোমার মত ছোট ছিলাম। কাজেই আইসক্রিমের প্রতি একটা আকর্ষণ ছিলো।
এখনকার মত এমন কাপ আইসক্রিমের প্রচলন তখন গ্রামে হয়নি। রঙিন কাঠি আইসক্রিম খাওয়ার প্রতি আমার অবশ্য অন্য একটি উদ্দেশ্য ছিল।

- কি উদ্দেশ্য ছিল?

- আইসক্রিম খেতে গিয়ে দুই ঠোঁট লাল করার তীব্র বাসনা।

- হ্যাঁ! তুমি রঙিন আইসক্রিম খেতে? ওটা তো কেমিক্যাল!
 
- হ্যাঁ ঠিকই বলেছ।ওটা কেমিক্যাল শুধু নয় যে বরফটা দিয়ে তৈরি হয় সেটা ডেড বডি সংরক্ষণ করার বরফ।

- আমি কখনোই এমন আইসক্রিম খাবো না।

- হ্যাঁ কথাটা সবসময় মনে রাখবে।

যাই হোক প্রতিবারই এমন রঙিন কেমিক্যাল আইসক্রিম খেয়ে বাড়ি এসে বড়দের প্রচন্ড বকা খেতাম।

- পাপা! আইসক্রিমের কথা শুনলাম কিন্তু একটা কথা শুনে মনে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে।

- কি কথা বাবা?

- তোমাদের ছোটবেলায় ঈদে একটাও জামা-কাপড় হতো না?

- না বাবা! আমাদের ছোটবেলায় ঈদে কোন জামা-কাপড় হত না। সব ভাই-বোনকে দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় তোমায় দাদুভাই আমাদের কাউকে কোন কোন জামা কাপড় দিতেন না। তবে ঈদে আমরা নতুন একটা জিনিস পেতাম।

- কি জিনিস পেতে?

- আমাদের ছোট চার ভাই-বোনের জন্য দাদুভাই চারটি ফাউন্টেন পেন নিয়ে আসতেন।

- ফাউন্টেন পেন! সেটা আবার কি?

- তুমি যে পেন দিয়ে লেখ এটাকে বলপেন বলা হয়। লক্ষ্য করবে যে লেখার জায়গাটাতে একটা ছোট্টো বল আছে যা থেকেই এর এরকম নামকরণ। এই পেনের রিফিল শেষ হলে আবার রিফিল ভরা যায়। কিন্তু আমাদের শৈশবে ব্যবহৃত ফাউন্টেন পেনে কালি শেষ হয়ে গেলে আবার নতুন করে কালি ভরার সুযোগ ছিল। বাড়িতে নীল ও কালো রংয়ের বড় বড় দুটি কালির দোয়াত ছিল। আমরা ড্রপারে করে কালি ভরে ইচ্ছামত পেনে ভরতাম। এখন অবশ্য এই ফাউন্টেন পেন একেবারেই লুপ্ত হয়ে গেছে। তবে অনেক বেশি দামের পার্কার কোম্পানির ফাউন্টেন পেন এখনো বাজারে আছে। যারা অত্যন্ত সৌখিন লোক তারা এখনো পার্কার পেন ব্যবহার করেন। দেখতে ভারী চমৎকার পেন গুলো।

- পাপা আমাকে একটা পার্কার পেন কিনে দেবে?

- নিশ্চয়ই! আমিও তোমাকে দিতে চাই। তবে সেটা পেতে গেলে যে তোমাকে একটা লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে হবে। তোমার যে বয়স সেই বয়সে তুমি ওই পেনের মূল্য বুঝবে না। অন্তত মাধ্যমিকে আশানুরূপ নম্বর পেলে আমি তোমাকে নিশ্চিত একটি পার্কার পেন উপহার দিব। হ্যাঁ যে কথা বলছিলাম,ঈদের কয়েকদিন আগে দাদুভাই চারটি ভিন্ন রংয়ের পেন নিয়ে আসতেন। তোমার বড় ফুম্মার কাজ ছিল চারটি প্লেট দিয়ে চারটি পেনকে ঢেকে দেওয়া। সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে এবার আমাদের চার ভাই-বোনের ডাক পড়তো। আমরা ছুটে গিয়ে একেকজন এক একটি প্লেটে হাত দিতাম।সকলের সামনে প্লেট তুলে পেতাম আমাদের জন্য রাখা বিভিন্ন রঙের পেনগুলি।
রং পছন্দ না হলেও ঝগড়া-ঝাঁটি করার আর সুযোগ ছিল না। সুতরাং আমার শৈশবের একটি ছোট্ট পেন পাওয়ার আনন্দ তোমার পাঁচটা/ছটা জামা কাপড় পাওয়ার চেয়েও ঢের বেশি ছিল।
যাই হোক গোসল সেরে গায়ে আতর লাগিয়ে দুই কানের লতিতে তুলো গুঁজে তোমার দাদু ভাইয়ের সঙ্গে আমরা ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা দিতাম। দাদুভাই ও বড়চাচ্চু ময়দানে ঢুকে যেতেন। আমরা ছোটরা বাইরে নামাজ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম। নামাজ শেষ হলে আবার তোমার দাদুভাইয়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরতাম। পাজামা পাঞ্জাবি না থাকার জন্য তোমার দাদুভাই আমাদের ময়দানের ভিতরে নিয়ে যেতেন না। আগে থেকে কেচে রাখা পুরানো হাফপ্যান্ট-শার্ট পরে আমরা ময়দানে যেতাম।অনেক পরে তোমার দাদুভাই যখন আমাদের ছোট দুই ভাইয়ের জন্য প্রথম পাজামা-পাঞ্জাবি কিনেছিলেন সেবার ছিল আমাদের শৈশবের সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদ। আমি প্রথম ঈদের নামাজ পড়ার ছাড়পত্র পেয়েছিলাম সে আনন্দ আমার স্মৃতিতে আজও ভাস্বর হয়ে আছে।

-এই সামান্য ছোট্ট ছোট্ট প্রাপ্তিতে তোমাদের এত আনন্দ হতো?

-ঠিক তাই! আমরা বাস্তবে এটুকুতেই ভীষণ খুশি হতাম।

তুমি শুনলে অবাক হবে যে ঈদের দিন খাওয়া-দাওয়াতেও আজকের সঙ্গে সেদিনের শৈশব ও কৈশোরের অনেক পার্থক্য ছিল। দাদীমা সুজির হালুয়া ও দুধ সেমাই তৈরি করতেন। তোমার দাদুভাই কিছুতেই অন্যান্য বাড়ি গুলির মত আগেভাগে ওসব নিয়ে আসতেন না। বড়জোর আগের দিন বা ঈদের দিন সকালে ঈদের সামগ্রী বাড়িতে আসত। তখন আমাদের বোঝার ক্ষমতা তৈরি হয়নি কেন দাদুভাই শেষ মুহূর্তে ওসব জিনিস বাড়িতে আনতেন। ফলে পাড়াতে অন্য কাউকে নিজের বাড়ির কথা শেয়ার করতে না পেরে দাদুভাইয়ের উপর প্রচন্ড অভিমান হতো। ছোট থেকে শুনে আসছি লাচ্ছার দামটা অনেকটাই বেশি। কাজেই আমাদের বাড়িতে লাচ্ছার প্রবেশাধিকার ছিল না। আগে থেকে বন্ধুদের মাধ্যমে খোঁজ খবর নিতাম পাড়ার কাদের বাড়িতে লাচ্ছা হচ্ছে সে সম্পর্কে। এমনও হয়েছে খোঁজখবর নিয়ে ঈদের দিন ঘুরতে গেছি বন্ধুদের বাড়িতে। কিন্তু গিয়ে পেয়েছি সুজির হালুয়া। চার পাঁচটি বাড়ি ঘুরে ফিরে মিষ্টি খেয়ে কোথাও একটু লাচ্ছা খাওয়ার সুযোগ পেলে তাহলে প্রচন্ড আমোদিত হতাম এবং সেই বাড়ির প্রতিটি সদস্যের প্রতি বহুদিন পর্যন্ত অন্তর থেকে কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে দিতাম।

-তাহলে পাপা আমার লাচ্ছা খেতে ভালো লাগে না কেন?

-ওই যে প্রথমেই বললাম তুমি না চাইতেই সব পেয়ে গেছো। যে জন্য আজকে তোমার মায়ের হাতে সেমাই,জর্দা সেমাই, লাচ্ছা সবকিছুই তোমার কাছে আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে।

-না পাপা না! আমি আর বলবো না। আমি এখনই গিয়ে মাকে বলে ঈদের মিষ্টি খাব। ‌

-এইতো আমার আদরের ছোট্ট সোনা।  


+লেখক: পদাতিক চৌধুরী
পথেঘাটে ঘুরে বেড়ান এবং আগডুম বাগডুম লিখেন।
লেখকের ব্লগ:ব্লগ ঠিকানা

লেখকের ফেসবুকঃআইডি লিংক