ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

মোর্স কোড: যুগান্তকারী এক সাংকেতিক ভাষা - লিখেছেন - বাধন বিশ্বাস


ভাষা, সভ্যতার বিকাশে যার অবদান অনন্য। ভাষার বিবর্তন সর্বদাই লক্ষণীয়।  প্রথমে শব্দ, কথা, লেখা, চিঠি, টেলিগ্রাম, মুঠোফোন ইত্যাদি বিভিন্নভাবে আমরা ভাষা ব্যবহার করে থাকি। সাংকেতিক ভাষা হল এর অন্যতম দিক। আর এই সাংকেতিক ভাষার বিশাল অংশ মোর্স কোড দখল করে রেখেছে।



সেলফোন এবং টেলিফোন উদ্ভাবনের অনেক আগে থেকেই মানুষ মোর্স কোডের মাধ্যমে যোগাযোগ করতো। প্রায় ১৬৩ বছর বয়সী এ প্রযুক্তিটি এখনো অপেশাদার রেডিও ব্যবহারকারীদের মধ্যে, বিমানে এবং কিছু জাহাজেও ব্যবহৃত হয়। স্কাউটগুলিতে এখনো মোর্স কোড বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সামরিক বাহিনীতে রয়েছে এর একচেটিয়া রাজত্ব। সাধারণত জরুরি সংকেত পাঠানোর জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। l

মোর্স কোডের ইতিহাস



মোর্স কোডের ইতিহাস: ১৮৩০ সালে স্যামুয়েল এফ বি মোর্স, (১৭৯১ - ১৮৭২) আবিষ্কার করেন মোর্স কোড। তার নামানুসারে এই কোড এর নামকরণ করা হয়। তিনি শুধুমাত্র একজন আবিষ্কারকই নন বরং তিনি তৎকালীন সময়ের অন্যতম সেরা পেইন্টার ছিলেন। 
ধারণা করা হয়, প্রায় ১২ বছর ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফ নিয়ে কাজ করে ১৮৪৪ সালে মোর্স কোড বাস্তবতার রুপ নেয় এবং ১৮৪৯ সাল থেকে এটি বিস্তার লাভ করে। প্রথমে সংখ্যা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বর্ণ এবং বিরামচিহ্ন যোগ করেন। তৎকালীন সময়ে এটি বিদ্রুপ এর শিকার হলেও বর্তমানে এর বিস্তার লক্ষণীয়। তৎকালীন সময়ে সেমাফর টেলিগ্রাফ থেকে এটি অধিক দূরে এবং অধিক কার্যকরী ছিল। 

১৮৪৪ সালে স্যামুয়েল এফ বি মোর্স  কংগ্রেসের সামনে তার সিস্টেমটি প্রদর্শন করেন এবং প্রথম যে মেসেজটি ট্রান্সমিট করা হয় তা হলো- 

“What God hath wrought” অর্থাৎ “স্রষ্টা যা সৃষ্টি করেছেন

আন্তর্জাতিক মোর্স কোডটি আমেরিকান মোর্স কোড অনুযায়ী ১৮৫১ সালে গৃহীত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মোর্স  কোড সংকেত SOS(· · · – – – · · ·) প্রথম জার্মান সরকার দ্বারা ১৯০৫ সালে ব্যবহৃত হয়, যা দুর্যোগ বিপর্যস্ত একটি জাহাজের জন্য। 

তিনটি ড্যাশ এবং তিনটি ডট এর পুনরাবৃত্তি প্যাটার্নটি সহজ ও সরল প্রকৃতির হওয়ার কারণে সহজেই নির্বাচিত হয়ে যায় ইমার্জেন্সি কেসে ব্যবহারের জন্য। মোর্স কোডে তিনটি ডট অক্ষর S এবং তিনটি ড্যাশ অক্ষর O  তৈরি করে, তাই এসওএস (SOS) কোডের ক্রমটি মনে রাখার জন্য একটি শর্টকাট পথ হয়ে ওঠে। 
পরে SOS -এর অর্থ ঘটনার ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হতে থাকে, যেমন “save our ship” যার অর্থ “আমাদের জাহাজ বাঁচান”অথবা “save our souls” যার অর্থ “বিপদ থেকে রক্ষা কর”। এই ‘SOS’ মোর্স কোড মনে রাখবার ও ব্যবহার করবার সহজ উপায় ছিল।




মোর্স কোড যেভাবে ব্যবহার করবেন   

# কম্পিউটার এর ভাষা যেমন ০ এবং ১ এর বিভিন্ন বিন্যাস তেমনই মোর্স কোড হল ডট(.) এবং ড্যাশ (-) এর বিন্যাস। যার এক একটি বিন্যাস এক একটি সংখ্যা, অক্ষর বা চিহ্ন প্রকাশ করে।  

# মোর্স কোড শুধু লিখে নয় শুনেও বা উচ্চারিত করেও ব্যবহার করা যায়, যার একটি বিপ ধ্বনি একটি ডট এবং তিনটি টানা বিপ ধ্বনি একটি ড্যাশ বোঝায়ে। এছাড়া নিফটি নামক একটি চার্ট ব্যবহার করে খুব সহজেই কোড অনুবাদ করা সম্ভব।   

নিফটি চার্ট ব্যাবহার করার নিয়মাবলী :  


প্রতিটি সময় আপনি একটি ডট (.)  শুনলে  নিচে এবং বাম দিকে মার্ক করবেন। আর যখন আপনি ড্যাশ (-) শুনতে পাবেন, তখন নিচে ডান দিকে মার্ক করবেন।
যেমন  - A এর মোর্স কোড হল “._”
১। স্টার্ট হতে শুরু করুন। একটি ডট এর জন্য একবার বামে যাবেন।                    
২। আবার একটি ড্যাশ এর জন্য একবার ডানে যাবেন , তখন চার্ট থেকে দেখা যায় A তে পৌঁছিয়েছে।এভাবে চাইলে যেকোনো মোর্স কোড ডিকোড করতে পারবেন এছাড়া এই লিঙ্ক এ  https://morsecode.world/international/translator.html ক্লিক করে।

যেভাবে মোর্স কোড দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে সহযোগিতা করেছিল।


জেঙ্কিন এবং তাঁর বন্ধু লি ছিলেন সাদা চামড়ার প্রথম দিকের বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনকারী। দক্ষিণ আফ্রিকায় তাদের বিদ্রোহ এর সময়ে গ্রেফতার করা হয়। তারা ছিলেন অন্যতম বড় অবদানকারী, তাই যখন তাদের গ্রেফতার করা হয় তখন অন্যান্য সব কর্মকাণ্ড শিথিল হয়ে আসে। তাই তাদের জেল থেকে ছাড়া পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তারা প্রেটোরিয়া এর জেল থেকে পালাতে সক্ষম হয়। সেখানে মোর্স কোড এর বিশাল অবদান ছিল। কারণ জেলে বসে তারা তাদের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে এই মোর্স কোড এর সাহায্যে এবং তারা পালিয়ে আসার পর আবার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। 

+লেখক: বাঁধন বিশ্বাস
St. Joseph Higher Secondary school,
প্রতিদিন শিখতে ও কিছু তৈরি করতে ভালোবাসেন। দক্ষতা অর্জন করার জন্য আগ্রহী থাকেন সবসময়।
লেখকের ফেসবুক:ফেসবুক আইডি লিংক