ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

বুদ্ধিজীবী প্রসঙ্গে (১) - লিখেছেন - রিয়াসাত মোর্শেদ খান


বুদ্ধিজীবীরা সমাজে কতোটুকু প্রাসঙ্গিক বা সমাজে তত্ত্বকথা কতোটুকু প্রাসঙ্গিক- এ ব্যাপারে আমার নিজের দুটি observation রয়েছে।
প্রথমত, disclaimer হিসেবে বলে রাখা ভালো, আমি বুদ্ধিজীবী বা চিন্তকদের সমাজের অত্যন্ত অত্যাবশ্যক উপাদান হিসেবে দেখি। অত্যাবশ্যকের parameter আমার কাছে হলো, তারা আমাদের চিন্তা এবং চৈতন্যকে নির্মাণ/বিনির্মাণ/পুনঃনির্মাণ করেন এবং You think, therefore you exist.




ধরেন আপনি বাস করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সমাজে। যুদ্ধ মাত্র শেষ হলো। আপনি ষাটের দশকে পা রাখছেন। ষাটের দশক এক রোমান্টিক সময়! দুনিয়ার মানুষ জেগে উঠছে। চারদিকে খালি Resistance- লাতিন আমেরিকা তো লেজেন্ড, খোদ ফ্রান্সেও ছাত্রদের সাথে শ্রমিকেরা নামছে- ল্যুভরে এমন আকাল মনে হয় নামেনি, ব্রিটেনে মানুষ ততোদিনে হতাশায় পাথর হয়ে the Beatles এ মুক্তি খুঁজে নিয়েছে- বিটলসের Paul McCartney বা কিংহাম প্যালেসে শো করতে গিয়ে বললেন “Rattle your Jewelries”। তারও বেশকিছু আগে Frantz Fanon বই লিখলেন “Black Skin, White Masks”.  

সেদিন আমি Aamer Rahman নামের বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান কমেডিয়ানের ভিডিও দেখছিলাম- যেখানে Whiteরা অভিযোগ করছেন, যে, ব্ল্যাকরা যখন হোয়াইটদের নিয়ে জোক করেন এবং এটা কেনো racism না? আপাতদৃষ্টিতে এ দাবি বেশ যৌক্তিক। because blacks are making fun of the white dudes and how come this not be racism whereas it is racism when it is done otherwise? তখন সেই কমেডিয়ানের যুক্তিগুলো ছিলো,

ক) যদি একে রেইসিজম বলতেই হয় তবে তার আফ্রিকান পূর্বপুরুষদের ইউরোপ দখল করতে হবে।

খ) শুধু দখল করাই নয়, সম্পদ চুরি করতে হবে।

গ) এরপর এমন চুরি যাওয়া ইউরোপে কলোনাইজড হয়ে যাওয়া লোকদের “দাস” হিসেবে treat করা হবে, barbaric, uncivilized হিসেবে গণ্য করতে হবে।

ঘ) এমন ভাবে শোষণ করতে হবে যেনো পুরো ইউরোপে সম্পদের অবশিষ্টাংশ না থাকে এবং বাধ্য হয়ে তারা আফ্রিকায় মাইগ্রেট করতে বাধ্য হয়।

ঙ) এমনভাবে socio-political system ডিজাইন করতে হবে যেনো পুরো সিস্টেম প্রিভিলেজড ব্ল্যাকদের অনুকূলে থাকে।

চ) এমনভাবে “চৈতন্য” নির্মাণ করতে হবে যেনো হোয়াইটরা তাদের গায়ের রঙ নিয়েও Insecurity তে ভোগে।

ঠিক একই, হুবহু একই বক্তব্য আপনি পাবেন কমেডিয়ান Trevor Noahর স্ট্যান্ড-আপ শো “Trevor Noah: Afraid of the Dark” এ। আরেক Singaporean কমেডিয়ান Jinx Yeo ঠিক একই যুক্তিগুলো দিচ্ছেন– একেবারে একই সেসব। কলোনাইজারদের নিয়ে এসব গল্প।




এসবের আলাপের সূত্রধরা আছে, ৩৬ বছরে অকালে মারা যাওয়া Frantz Fanon তে। ফাঁনো তার বইয়ে এনেছেন, কিভাবে একজন ব্ল্যাক মননে-চিন্তায় ক্রমাগত হোয়াইট হতে চায়। তিনি sarcastically বইয়ের নামও দিয়েছেন সেভাবে- কালো চামড়া কিভাবে তার নিজের রঙ সাদা মুখোশ দিয়ে আড়াল করতে সর্বদাই ব্যস্ত থাকে-কারণ কলোনি তাকে এভাবেই শিখিয়েছে- একজন মানুষ হিসেবে তার মনোজগত কিভাবে দাসের মনোজগতে পরিণত হয় সেটা মনোসমীক্ষক ফাঁনো তুলে এনেছেন আমাদের সামনে-সর্বপ্রথমে। সেই ষাটের দশকের আগে।
ঠিক ষাটের দশকের আগে কেউ কি এভাবে ভেবেছিলো?
উত্তরটি হলো,"না।"
ঠিক যে মুহূর্তে ফাঁনো, বিশ্ববিদ্যালয়ে বা তার চেম্বারে জ্ঞানটি উৎপাদন করলেন, তার ৬০ বছর পরে সাউথ আফ্রিকান ট্রেভর, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান আমির রহমান, সিঙ্গাপুরিয়ান জিংক্সইয়াও- যাদের দাদারা ব্রিটিশ চাকর ছিলেন- আজকে মানুষকে সেই জ্ঞানের সংস্পর্শে আনছেন, যেটা বানিয়েছিলেন ফাঁনো।

ফাঁনোর এই চিন্তার পিছনে ছিলেন, ফরাসী উপনিবেশের অধীনে থাকা মার্টিনিকে জন্ম নেয়া তার গুরু Aime Cesair. মার্টিনিক দ্বীপ থেকে এই মনোসমীক্ষা উৎপাদিত না হলে আমরা এই Full proof stock arguments পেতামনা- কিংবা ছাড়া ছাড়া ভাবে এই discreet কথাগুলোর ঐকতান আপনি শুনতেন না- এই জ্ঞান জাগতিক অর্কেস্ট্রা পেতেন না- যেখানে ওশেনিয়া, সিঙ্গাপুর বা আফ্রিকা একসাথে মিলতো।



এখন আপনি পৃথিবীর যেকোনো কাউকে রেইসিজম নিয়ে তর্ক করতে দেখবেন-অবধারিতভাবে যে আর্গুমেন্টস উঠে আসবে সেসব আদতে ফাঁনো এবং সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের বানানো। আপনি ফাঁনো না পড়তে পারেন কিন্তু আর্গুমেন্টগুলো ঠিকই জানেন। এই যে চৈতন্য-এরকম কিছু exist করতে পারে-এরকম কিছু হতে পারে- এটাই চিন্তকরা শিখিয়ে দেন।  




এরপরে যাঁর কথা না বললেই না, তিনি হলেন জয়গুরু নোয়ামচমস্কি। সাথের আরেকজন আন্তোনিওগ্রামসি। গ্রামসি ভদ্রলোক ইটালিয়ান, মুসোলিনির দয়া-দাক্ষিণ্যে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন কারাগারে। কারাগারে বসে চোথা লিখেছেন- Prison Notebook। এখানে তিনি ফ্যাসিবাদের স্বরূপ নিয়ে চর্চা করেছেন। বহুল চর্বিত “Hegemony”, “Subaltern” শব্দগুলো তার কাছ থেকেই ধার করা। আর চমস্কি নিয়ে কিছু বলা উচিত হবে না। ভদ্রলোক এখনো বেঁচে আছেন এবং মার্কিন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এই “বিশ্ববিবেক” তার “Subversive” কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দীর্ঘজীবী হউন। 

তো গ্রামসিসেই, ১৯৩০ এর দশকে ইতালির এক কারাগারে বসে লিখেছেন কিভাবে ক্ষমতায় থাকতে হলে বন্দুকের নল আর যথেষ্ট না। বরঞ্চ জনগণের কাছ থেকে সম্মতি আদায় করে নিতে হয়। কথাটা আপাতদৃষ্টিতে Counter intuitive বলে মনে হয়- কিন্তু মুসোলিনি, হিটলার সবাই-ই কিন্তু সমানে “জনপ্রিয়” ছিলেন- শুধুমাত্র Violence কিন্তু তাদের শক্তি মত্তা ছিলো না।

আজকের বাংলাদেশে আপনি যে-মুহূর্তে প্রশ্ন করেন “বিকল্প কই”- তখন আসলে আপনি আপনাকে শাসনের কনসেন্টটি দিয়ে দেন। যে-ই মুহূর্তে আপনাকে রাষ্ট্র  “উন্নয়ন না গণতন্ত্র”র False Dichotomy দেখায় আর আপনি খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার জন্য বলেন “উন্নয়ন”- তখন আসলে আপনি কনসেন্ট দিয়েদেন। এভাবে Manufactured Consent কাজ করে। চমস্কি এই Manufactured Consent নিয়ে কাজ করেছেন মিডিয়া স্টাডিজে।




চমস্কি দেখাচ্ছেন, কিভাবে যার উপর হামলা হবে সেটাকে জাস্টিফাই করতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হচ্ছে। যার ফলে আপনি মনে করেন “আচ্ছা, ওরা তো খারাপই”। George Bush যখন বলেন, ইরাকের হাতে রাসায়নিক অস্ত্র আছে এবং BBC-CNN এর মতো নির্লজ্জ বেহায়া মিডিয়া মোগলরা যখন ক্রমাগত বুশের চেহারা দেখাচ্ছে তখন শ্বেত বরফের কোনো একটা দেশে থাকা জনৈক জন/রবার্ট/ম্যাথিউ/স্টিফেন ভাবলেন সাদ্দাম হুসেন লোকটাতো খারাপই। তাকে হামলা করাই যায়”। এভাবে আপনাকে থামানো হয়। আপনি ইরাকে হামলা “মানবতা”র খাতিরে সমর্থন করলেন- চমস্কিরা বললেন এটা আপনার Consent নয়, এটা আপনার সমর্থন নয়। এই Consent Manufacture করা হয়েছে।
পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে সম্মতি উৎপাদনের কায়দাকে ব্যাখ্যা করার জন্য চমস্কি বেছে নিয়েছেন " Manufacturing Consent" শব্দটিকে; আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেবার জন্য, যে, আমাদের "সম্মতি" বা consciousnessও কারখানায় উৎপাদিত আর দশটা পণ্যের মতো যাকে manufacture করা যায়। (প্রসঙ্গত এই শব্দটি প্রথম "উদ্ভাবন" করেছেন Walter Lippmann যিনি নিজেই এমনটা sarcastically নয়, আসলেই বিশ্বাস করতেন, যে, জনগণ হচ্ছে “Bewildered herd”, যাদের এভাবে বোকা বানিয়ে “লাইনে” রাখতে হয়)

আজকে, ফেমিনিজমের ডিবেটগুলোতে যখন কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে নারীর দেহের উপর স্বাধীনতার বুলি ফুটিয়ে কর্পোরেটরা যখন প্রকৃত অর্থে নারীদের নিয়ে ব্যবসা করেন, তখন উঠে আসে "Consent Vs Manufactured Consent".  আজকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় চলে আসে "Consent Vs Manufactured Consent". আজকে Psychoanalyst যখন মানুষের আচার-আচরণ নিয়ে গবেষণা করেন- মানুষ কেনো একটা নির্দিষ্ট আচরণ করে তখন চলে আসে Consent Vs Manufactured Consent. ঠিক একইভাবে নৃতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব- আপনার কাছে কষ্টিপাথর আছেই। Consent নাকি Manufactured Consent. 


এখানেই একজন চিন্তকের প্রভাব। আপনি তার নাম না জানতে পারেন, আপনি না জানতে পারেন গ্রামসিকে কিংবা না জানতে পারেন ফাঁনোকেও। কিন্তু তাদের ভূত আপনাকে তাড়া করে ফিরবে। হয়তো বন্ধুর সাথে তর্কে কিংবা নিউজপেপারের এডিটোরিয়ালে কিংবা অর্থহীন এই ফেসবুক স্ট্যাটাসেও।

+লেখক: রিয়াসাত মোর্শেদ খান,
পড়ছেন নৌযন্ত্রকৌশলে।শহুরে সন্ধ্যায় বন্দরে রুমাল নেড়ে জাহাজ তাড়ানোর দায়িত্ব নেয়ার পাশাপাশি ইতিউতি খুঁজে ফিরছেন মানে, রূপক, সম্পর্কশাস্ত্র এবং ইত্যাদি ইত্যাদি!

লেখকের ফেসবুকঃফেসবুক আইডি লিংক
উল্লেখ্য যে, লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো লেখকের ফেসবুকে।