ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

রহস্যগল্পঃদি সুইসাইড - লিখেছেন - মারজুকার রাহিব

রায়হান আহমেদের চেম্বার ঘরে বসে থাকা মহিলাটিকে দেখলে, সাজপোষাকে মধ্যবিত্তই মনে হয়।
গতকালের পত্রিকায়  প্রাইভেট ডিটেকটিভের এজেন্সির বিজ্ঞাপনে আজ সকালেই ক্লায়েন্ট হাজির! জনগণের দুঃখ আর সন্দেহের শেষ নেই আজকাল। তবে সত্যি বলতে, মনে মনে অবাকই হয়েছে রায়হান।
বলে রাখা ভালো যে, পৈতৃক আশীর্বাদে টাকা পয়সার টানাটানি নেই রায়হানের। গুলশানের ফ্ল্যাট দুটিই তার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ক্ষুরধার বুদ্ধিটাতে যাতে জং না ধরে, তাই বহু ভাবনাচিন্তা ও পড়াশোনার পর ডিটেকটিভ এজেন্সী খুলেছে সে।

-"পেপারে আপনার বিজ্ঞাপণ দেখে ছুটে এলাম, আমাকে একটু সাহায্য করুন দয়া করে!"
অদ্ভুত তাড়াহুড়ো করে কথাগুলো বললেন ভদ্রমহিলা।
-"সাধ্যের মধ্যে সবকিছুই করবো আপনার জন্য। কিন্তু, কেসটা কি?"
প্রফেসনাল ভয়েস টোনটাই প্রাইভেট ডিটেকটিভেরদের সৌন্দর্য।  
আবার চটজলদি কিছু বলার জন্য ব্যস্ত হতেই, ভদ্রমহিলাকে থামিয়ে দিলো রায়হান। কিছু চোখে পড়েছে নাকি তার?
-"প্রথমে একটু শান্ত হোন আপনি। কি খাবেন বলুন, গ্রিন টি না ব্রাউন কফি?"

ভদ্রমহিলা কেমন জানি হকচকিয়ে থমকে গেলেন।
-"গ্রিন টি।"

-"একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে ছদ্মবেশে আসার অর্থ কি? প্রাইভেট ডিটেকটিভেরা ডাক্তারের মতো। কিছু লুকিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ক্লায়েন্টেরই সর্বনাশ।"

-"আা..আপনি কি বোঝাতে চাইছেন?"

-"আপনার কানের ছোট্ট দুলটিতে বসানো বাদামী পাথরটির বাজারমূল্য ২০ হাজার টাকা। হয়তো তাড়াহুড়োয় খুলতে ভুলে গেছেন। নিজেকে মধ্যবিত্ত প্রমাণের চেষ্টাটি মাঠে মারা গেলো"
একটু মুচকি হাসলো রায়হান।

মহিলাকে এখন একটু আশ্বস্ত দেখাচ্ছে। কিন্তু নিশ্চিন্ত মনে হচ্ছে না।
চায়ের কাপটা সরিয়ে রেখে একটু দুঃখী গলায় প্রশ্ন করলেন অবশেষে।

-"আমি দুঃখিত। কিন্তু আপনি বুঝলেন কি করে?"
 
-"তেমন কিছু না। নিয়মিত পার্লারে যাওয়ার ফলে আপনার ভুরু গুলো সুন্দর দেখাচ্ছে। তাছাড়া পোষাকেও স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন না হয়তো। তবে আপনি যে একজন গড়পড়তা মধ্যবিত্ত নন, তার প্রমাণ আপনার গ্রিন টি খাওয়ার ধরণ । নিয়মিত না খেলে কেউ এটা খেতে শান্তি পায়না।"

মহিলা কাঁদো কাঁদো গলায় আবার সাহায্য চাইলেন। টাকা পয়সা কোন ব্যাপার নয় ওনার কাছে । রায়হানকে ওনার ভরসা হচ্ছে ।

-"ভুল হলে মাপ করবেন আপনি কি সন্তান হারিয়েছেন ।।।।? "  
ভদ্রমহিলা  আর আটকে রাখতে পারলেন না সন্তান হারানোর বেদনা । গাড়িতে করে রায়হানকে নিয়ে নিকেতনের বাসায় ওঠার আগ পর্যন্ত কেঁদেই চললেন।

রায়হান খেয়াল করেছিলো চা পানের সময় টেবিলের উপর রাখা পত্রিকার দিকে একমনে তাকিয়ে ছিলেন ভদ্রমহিলা। ডায়পারের অ্যাডে একটি মিষ্টি শিশুর দিকে ছলছল করে তাকিয়ে ছিলেন। হয়তো, নিজের হারানো সন্তানের, শৈশবের দিনগুলোর কথা মনে পড়েছে তার।
মিসেস শর্মিলার ১৭ বছর বয়সী মেয়ে সাত দিন আগে সুইসাইড করেছে। মিসেস শর্মিলার ভাষ্য মতে, তিনি অফিস, বিজনেস এগুলো নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন সবসময়। তার মেয়ের সাথে একটি ছেলের সম্পর্কবিচ্ছেদের কথা তিনি জানেন। কিন্তু, মেয়েকে তিনি সান্তনাও ঠিক মতো দিতে পারেননি কাজের ব্যস্ততায়। মেয়েটি নিশ্চয়ই শেষ দিনগুলোতে হতাশায় ভুগতো।

কিন্তু, মিসেস শর্মিলার ধারণা, তার সম্পত্তি আত্নসাতের জন্য, শ্বশুরপক্ষের কেউ তার মেয়েকে পরিকল্পভাবে হত্যা করেছে। পুলিশের মুখ বন্ধ করতেও তারা নিশ্চয়ই কিছু করেছে। এখন তিনি চান, রায়হান সব কিছু তদন্ত করে দেখুক। তিনি লক্ষ টাকা দিয়ে হলেও, নিজের একমাত্র সন্তানের খুনের রহস্য মিমাংসা করবেন।

রায়হান মৃত মেয়েটির ঘর তল্লাশি করলো। তার প্রথম কেস এমন একটি আবেগীক ব্যাপারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে, তা সে কল্পনাও করেনি। কিন্তু পুরো বাসাটি তল্লাশি করে রায়হানের মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো।

-"আপনার মেয়েকে কেউ খুন করেনি মিসেস শর্মিলা..।"

-"কি বলছেন আপনি এসব!!"

-"আপনি আরেকটি মিথ্যা কথা বলেছেন আমার কাছে।"

-"কি?! কি মিথ্যা কথা বলেছি আমি!!"
পাগলের মতো চিৎকার করে জবাব দিলেন মহিলা। আসলে সেও বুঝতে পেরেছে, রায়হান সত্য উৎঘাটন করে ফেলেছে।

-"আপনি কোন ধরনের ব্যবসা বা কর্মব্যস্ততায় মেয়েকে সময় দিতে পারেননি, বিষয়টি এমন না। আপনার মেয়ে আসলেই ডিপ্রেসড ছিলো। আমি ওর একটি ডায়রি খুজে পেয়েছি আপনাদের বড় পারিবারিক ছবিটির পেছনে.."

হয়তো রায়হানের কথার তাৎপর্য বুঝতে পেরেছেন মিসেস শর্মিলা। একটু পরেই তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন।



২.
রায়হান মিসেস শর্মিলার ঘর তল্লাশি করে বুঝতে পেরেছে, ওনার পোশাক এবং পারফিউম সব জাঁকজমক এবং পার্টির জন্য ক্রয় করা। মিসেস শর্মিলার বিজনেস বা কর্মব্যস্ততার কোন চিহ্ন তার ঘরে নেই।
নিজের মেয়ের দুর্দিনে তিনি মেয়েকে সময় না দিয়ে পার্টিতে গেছেন। মেয়েকে অন্যায় ভাবে মন্দ কথা শুনিয়েছিলেন। কিন্তু তার মেয়ের কোন দোষ ছিলোনা সেই সম্পর্কের ব্যাপারে।

মেয়ে আত্নহত্যা করতে পারে, এটা স্বপ্নেও ভাবেননি শর্মিলা। এখন দুঃখের অসীম ভারে তার সমগ্র জীবন তার কাছে মিথ্যা মনে হচ্ছে। তাই নিজের মনের একাকীত্ব আর ব্যর্থতা ঢাকতে তিনি কল্পনা করেছিলেন, তার মেয়েকে কেউ খুন করেছে।

ঘরে ফিরে এলো রায়হান।
কিন্তু পরদিন সকাল থেকেই নতুন একটা কেসে জড়িয়ে গেলো সে, যা হয়তো তার জীবনকে নতুন মোড় ঘুড়িয়ে দিবে!
(চলবে)


+লেখক: মারজুকার রাহিব,
সরকারি বিজ্ঞান কলেজের ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের ছাত্র। রহস্য, রোমাঞ্চ আর মারবেল ডিসির দারুণ ভক্ত, এই নতুন লেখক।
ফেসবুক লিংক:ফেসবুক আইডি