ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

দি ওয়ার্ল্ড ক্লাস "ওয়াটার ক্যারিয়ার" বয় - লিখেছেন - শোয়েব সামায়েল সোহান


তখন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড পজিশনটা খুব জনপ্রিয় ছিল না। দিদিয়ের দেশাম এই পজিশনে খেলার কারণে তার ফরাসী সতীর্থ এরিক ক্যান্টোনা তাকে তাচ্ছিল্য করে ডাকতেন “ওয়াটার ক্যারিয়ার” বলে। মানে দেশামের কাজ হচ্ছে দলের প্রধান প্লেয়ারদের বল পাস করা, এটা মাঠে পানি টানার মতোই সোজা একটা কাজ। কিন্তু এই ওয়াটার ক্যারিয়ার যে ফ্রান্সকে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ এনে দিবে তা হয়তো তখন ক্যান্টোনার জানা ছিল না।
১৯৬৮ সালে, জন্ম দিদিয়ের দেশামের। খেলোয়াড় জীবন শুরু করেন ফ্রেঞ্চ ক্লাব নান্তে তে। ৪ বছর পর যোগ দেন আরেক ফ্রেঞ্চ ক্লাব মার্শেইতে, যেখানে শুরু হয় তার শিরোপা জয়ের ধারা। দুইবার ফ্রেঞ্চ লীগ জেতেন মার্শেইয়ের হয়ে, তবে এখানেই শেষ নয়। ইউরোপিয়ান কাপের নাম পরিবর্তন করে যখন ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ রাখা হয়, সেই চ্যাম্পিয়ন্স লীগের প্রথম আসর জিতে দেশামের মার্শেই, ফাইনালে হারায় শক্তিশালী ইতালিয়ান ক্লাব এসি মিলানকে। দেশামের টেকনিক, খেলার কৌশল ও প্রতিভা নজর কাড়ে ইউরোপের অনেক দলের। শেষে তাকে দলে নিতে সফল হয় জুভেন্টাস। সেখানে তার সাফল্য ছিল আকাশ ছোঁয়া। ৩টি লীগ টাইটেল, ১টি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, ১টি কোপা ইতালিয়া, ২টি সুপারকোপাসহ আরো বেশ কিছু শিরোপা জয় করে জুভেন্টাস দেশামের সময়ে। ১৯৯৬ সালে ফ্রেঞ্চ প্লেয়ার অফ দা ইয়ার নির্বাচিতও হন তিনি। তবে সেই সময় তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে জাতীয় দলের হয়ে। 



১৯৯৮ সালে ফ্রান্স নিজেদের ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জিতে সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন এই দেশাম। তার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড রোলের গুরুত্ব জানতে বাকি থাকে না কারো। এরপর তার অধিনায়কত্বে ফ্রান্স ২০০০ সালে ইউরো শিরোপাও জয় করে। এর মাঝে অবশ্য জুভেন্টাস ছেড়ে তিনি চেলসিতে যোগদান করেন এবং শুধু সেখানে এক সিজন খেললেও জিতে নেন এফএ কাপ শিরোপা। খেলোয়াড় জীবনের শেষ সিজনটা কাটান স্প্যানিশ ক্লাব ভ্যালেন্সিয়াতে যেখানে অল্পের জন্য ব্যক্তিগত তৃতীয় চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জয় থেকে বঞ্চিত হন, রানার্সআপ হয়েই খুশি থাকতে হয় দেশামকে।   
এরপর ২০০১ সাল থেকেই শুরু হয় তার ম্যানেজেরিয়াল জীবন। ফ্রেঞ্চ ক্লাব মোনাকোতে যোগদান করেন এবং ২০০৩-০৪ মৌসুমে ফ্রেঞ্চ লীগ কাপ জয় করেন এবং মোনাকোর ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে তুলেন কিন্তু ২০০০-০১ সিজনের মতো এবারও তাকে রানার্সআপ মেডেল পেতে হয়, তবে এবার ম্যানেজার হিসেবে। মালিক পক্ষের সাথে মতবিরোধ হওয়ায় মোনাকো ছাড়েন তিনি ২০০৪ সিজনের শুরুর দিকে। ২০০৬ সালে ফিরে আসেন জুভেন্টাসে তবে সময়টা ভালো যাচ্ছিলো না তখন তাদের। ম্যাচফিক্সিংয়ের দায়ে ইতালিয়ান দ্বিতীয় শ্রেণীর লীগ সিরি-বিতে নামিয়ে দেয়া হয় জুভেন্টাসকে। সেই ডুবতে বসা জাহাজকে আবার উপরে তুলে আনেন দেশাম। এক সিজনের মধ্যেই সিরি আ তে ফিরে আসে জুভেন্টাস, কিন্তু সেই সময়ই ব্যক্তিগত কারণে ক্লাব ছাড়েন দেশাম। যেন ক্লাবটিকে আবার নিজের পায়ে দাঁড়া করাতেই এসেছিলেন তিনি। 




২০০৯ সালে আবার তাকে ম্যানেজার হিসেবে দেখা যায়, এবার তার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাব মার্শেইয়ের হয়ে। সেখানে দেশাম্প থাকেন ৩ বছর যার মধ্যে তিনি ক্লাবকে ১টি লীগ টাইটেল ও ৩টি লীগ কাপ জিতান। এরপর শুরু হয় দেশামের জীবনের আরেক নতুন অধ্যায়। ইউরো ২০১২ তে ব্যর্থ ফ্রান্স জাতীয় দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন তিনি। প্রাথমিক চুক্তি ২ বছরের হলেও তা ২০১৪ ওয়ার্ল্ড কাপের পর বাড়ানো হয়। নিজেদের মাঠে ইউরো ২০১৬ এর অন্যতম ফেভারিট দল ছিল ফ্রান্স, টুর্নামেন্ট খেলেও ফেভারিটের মতো কিন্তু ভাগ্যদোষে ফাইনালে তাঁরা হেরে পর্তুগালের কাছে। প্রথম ব্যক্তি যে খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে ইউরো জিতেছে রেকর্ডটি অধরা থেকে যায় দেশামের। 
তবে সব কিছু ছাপিয়ে, দিদিয়ের দেশাম ইতিহাসের পাতায় আজীবন অমলিন হয়ে থাকবেন ২০১৮ রাশিয়া ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য। কেননা ফুটবল ইতিহাসে ফ্রান্সের হয়ে দেশামই প্রথম ব্যক্তি যিনি খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন!

২০১৮ সালে দেশাম জিতে নেন, The Best FIFA Men's Coach অ্যাওয়ার্ডটিও। ফুটবলের পৃথিবীতে কোচ হিসেবে দেশামের আরো ভবিষ্যৎ সাফল্য দেখার প্রত্যাশায় রইলো লেখক এবং ইতিহাসনামা টিম! 


লেখক: শোয়েব সামায়েল সোহান, একজন আপাদমস্তক ফুটবল প্রেমী মানুষ। আসছে দিনে ফুটবল নিয়ে সামায়েল সোহানের কাছ থেকে কিছু পড়তে চাইলে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।
ফেসবুক আইডিঃফেসবুক লিংক